Pages

Finance and Travel Ideas

Showing posts with label ভুতের গল্প. Show all posts
Showing posts with label ভুতের গল্প. Show all posts

Sunday, 22 July 2018

কায়াহীনের কাহিনী।

স্বামীর কথা আজও মনে পড়ে সুমিতার। স্বামী অল্প বয়েসেই তাকে ছেড়ে চলে যায়, কারণ সেই দুরারোগ্য ব্যাধি, ক্যান্সার। স্বামী তাকে খুবই ভালবাসত, অভাবের সংসার হলেও তাদের আনন্দের কোন অভাব ছিল না। হঠাৎই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত রাজীবের ফুসফুসে ক্যান্সার ধরা পড়ল। সুমিতার একমাত্র অপছন্দের কারণ ছিল রাজীবের চেন স্মোকিং আর সেটাই কাল হল। মাত্র ৩১ বছর বয়েসেই এই পৃথিবী ছেড়ে তাকে চলে যেতে হল। সুমিতা একা হয়ে গেল। এক ঝটকায় তার সুন্দর জীবনে অন্ধকার নেমে এল। সে কোনরকমে একটা চাকরি জোগাড় করল কিন্তু মনে আর শান্তি রইল না।

স্বামী মারা যাবার পর বেশ কয়েকমাস হয়ে গেছে। সে অফিসে বেশ কিছুদিন ধরেই একটা গুরুত্বপূর্ণ ফাইল খুঁজে পাচ্ছিল না। বসের বকাবকি খেয়ে মনমেজাজ বেশ খারাপ। সোমবার অফিসে গিয়ে সে অবাক হয়ে গেল। তার টেবিলের ওপরেই ফাইলটা পড়ে রয়েছে। আশেপাশের সহকর্মীদের জিজ্ঞাসা করল কেউ নিজে থেকে ফাইলটা খুঁজে পেয়ে দিয়ে গেছে কিনা। কেউই কিছু বলতে পারল না। সুমিতা এর কোন যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা খুঁজে পেল না। যাই হোক, এই ব্যাপারটা নিয়ে খুব বেশি সে আর মাথা ঘামাল না। হয়ত কোন উপকারী বন্ধু, যে নিজের পরিচয় দিতে অনিচ্ছুক।

কয়েকদিন পরের কথা। সুমিতা নিজের ঘরে বসে রয়েছে। সন্ধ্যে পেরিয়ে রাত নামতে যায়। হঠাৎ মনে হল যেন পাশের ঘর থেকে কেউ খুব আস্তে বেহালা বাজাচ্ছে। গাটা যেন ছমছম করে উঠল তার। রাজীবও বেহালা বাজাতে খুব ভালবাসত। কিন্তু এ কি করে সম্ভব? পাশের ঘরে একবার গিয়ে দেখবে নাকি? সাহস করে একবার দরজাটা ঠেলে দেখল আবছা অন্ধকারের মধ্যে যে দোলান চেয়ারে বসে রাজীব মাঝে মধ্যে বেহালা বাজাত, সেই চেয়ারটা ক্যাঁচকোঁচ শব্দ করে দুলছে। সারা শরীরে যেন একটা শিহরণ বয়ে গেল সুমিতার। তবে কি রাজীবের অতৃপ্ত আত্মা পৃথিবীর মায়া কাটাতে পারেনি? তার আশেপাশেই ঘুরছে? তাকে ভুলতে পারছে না? এটা কি শুভ না অশুভ ইঙ্গিত? সুমিতা আর ভাবতে পারছে না।

আরেকদিনের কথা। সুমিতা বাজার করে সকালবেলা ফিরছিল। বাজারের আগে রাস্তাটা পার করতে গিয়ে মনে হয় একটু অন্যমনস্কই হয়ে পড়েছিল। হঠাৎই সামনে চলে এল যমদূতের মত এক প্রকাণ্ড লরি। সুমিতার মনে হল বোধহয় এই তার জীবনের শেষ মুহূর্ত। আর তার বাঁচা হল না। হঠাৎই লরির ড্রাইভার যেন কি দেখে ভয়ে প্রাণপণ চিৎকার করে সশব্দে ব্রেক কষল। সুমিতা চোখ বন্ধ করেই ফেলেছিল। ভয়ে ভয়ে চোখ খুলে দেখে যে সে বহাল তবিয়তে রয়েছে এবং লরিটা ঠিক তার দুহাত সামনে থেমে রয়েছে। সম্পূর্ণ অলৌকিক ব্যাপার। আস্তে আস্তে নিজেকে সামলে নিয়ে সুমিতা বাড়ি ফিরে এল। ড্রাইভারটা তখনও “ভুত ভুত” বলে বিড়বিড় করছে।   

আরও কয়েকদিন পরের কথা। দুপুরের রান্না চাপিয়ে চেয়ারে বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিল সুমিতা। কখন যে চোখের পাতাদুটো ভারি হয়ে এসেছে খেয়াল নেই। হঠাৎ রান্না পোড়া যাওয়ার গন্ধে তার চটকা ভাঙল। একি? রান্নাঘরে তো পুরো দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে! গ্যাস সিলিন্ডারটা লিক করেছে নির্ঘাত। এইবার তার আর পরিত্রাণ নেই। চোখ বুজে ইষ্টনাম জপ করতে শুরু করল। হঠাৎ করে কে যেন এক বালতি জল রান্নাঘরের মধ্যে ছুঁড়ে দিল। তাজ্জব ব্যাপার। সুমিতা দেখল জাদুমন্ত্রের মত আগুনটা নিভে গেল। এইভাবে সে আরেকবার ভয়ংকর বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেল। মনে মনে সে সেই অশরীরী অথচ উপকারী বন্ধুকে ধন্যবাদ জানাল। 

আরেকদিনের ঘটনা। অফিস থেকে বেরোতে বেশ দেরিই হয়ে গেছিল সুমিতার। তার বাড়ির আগে একটা পার্ক পড়ে যেখানে রাত্রিবেলা কিছু সমাজবিরোধী আস্তানা গাড়ে। পার্কটার কাছে পৌঁছে লক্ষ্য করল তিন চারজন লোক তার পিছু নিয়েছে। সে ভয় পেয়ে পা চালিয়ে হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু লোকগুলোও চলার গতি বাড়াল। খারাপ মতলবই মনে হচ্ছে। মনে মনে সুমিতা ইষ্টনাম জপ করতে লাগল। হঠাৎই দুটো লোক লাফ দিয়ে পড়ে সামনে রাস্তা আটকাল। মুখে একটা অশ্লীল মন্তব্য করে তার দিকে এগিয়ে এল। আজকাল মেয়েরা আত্মরক্ষার জন্য লঙ্কার স্প্রে, ছোট ছুরি এবং আরও অন্যান্য জিনিস সঙ্গে রাখে। দুর্ভাগ্যবশত আজ ও রকম কিছুই তার সঙ্গে নেই। ভয়ে তার গলা শুকিয়ে এল। নাহ, আজ নিজের সম্মানটুকু রক্ষা করা যাবে বলে মনে হয় না। হঠাৎই জাদুমন্ত্রের মত একটা ব্যাপার ঘটে গেল। একদম সামনের লোকটাকে অদৃশ্য কেউ যেন এক ধাক্কা মেরে ছিটকে ফেলে দিল। পাশের জনকে কেউ যেন জামার কলার ধরে মাটি থেকে হাতখানেক উপরে তুলে দিয়েছে। ভয়ে হাত পা ছুঁড়ছে লোকটা। ব্যাপার স্যাপার দেখে অন্য দুটো লোক বেশ ঘাবড়ে গেল। পিছু ফিরে দে দৌড়। এরকম কাণ্ড কারখানা জীবনে তারা দেখেছে বলে মনে হয় না। সুমিতার সামনের দুটো লোকও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কিছুক্ষণ নিজেদের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাল। সুমিতা কিছুক্ষণ হতভম্বের মত দাঁড়িয়ে থেকে পায়ে পায়ে নিজের ফ্ল্যাটের দিকে হাঁটা দিল। আজও সে এক ভয়ংকর বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেল। রাজীব যেন অন্য জগতে গিয়েও তাকে ভুলতে পারেনি। কায়াহীন অস্তিত্ব নিয়েও তাকে সবসময় অনুসরণ করে চলেছে এবং সব রকম বিপদের হাত থেকে রক্ষা করে চলেছে। সুমিতা মনে মনে ঈশ্বরকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাল এই ভেবে যে এই অলৌকিক ঘটনা খুব কম লোকের জীবনেই ঘটে আর সে এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে পেরেছে। এক অপূর্ব প্রশান্তিতে তার মন ভরে উঠল।

Saturday, 23 June 2018

বৈশিষ্ট্য।

সুদেষ্ণার খুবই অদ্ভুত লেগেছিল যখন এত খেলনা থাকতে মেয়ে রিমি ওই পুতুলটা কিনে দেবার জন্যই বারবার করে বায়না করছিল। মেয়ে খুবই জেদি আর বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে মার কাছেই তার সব চাহিদা। এমনিতে হট হুইলস বা জি আই জো বেশি পছন্দ করে, বারবি ডলও অপছন্দ নয়, কিন্তু আজকে নিউ মার্কেটের এই খেলনার দোকানে এসে সে যেন কিছুতেই ওই অদ্ভুত পুতুলটার থেকে চোখ সরাতে পারছিল না। পুতুলটা একটা মেয়ে পুতুল কিন্তু মুখের অভিব্যক্তি একদমই আর পাঁচটা সাধারণ পুতুলের মত নয়। কেমন যেন ভাবলেশহীন ভাবে তাকিয়ে রয়েছে, চোখগুলোও যেন বিস্ফারিত। হঠাৎ দেখলেই যেন গাটা কেমন শিউরে ওঠে। যাই হোক, মেয়ের বায়না সামলাতে না পেরে তিনশ টাকা দিয়ে কিনেই দিল পুতুলটা। কিন্তু মনটা যেন কেমন খচখচ করতে লাগল।

অনেকক্ষণ পুতুলটা নিয়ে খেলার পর রাত্রিবেলা পুতুলটা মাথার কাছেই নিয়ে শুয়ে পড়ল রিমি। সে আজকে খুবই খুশি মা তার বায়না মেনেছে বলে। মাঝরাতে হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল তার। করিডোরের আলোটা যেন কে জ্বালিয়ে দিয়েছে আর কেউ যেন দাঁড়িয়ে রয়েছে দরজার কাছে। ভালো করে দেখার আগেই যেন মূর্তিটা অদৃশ্য হয়ে গেল। আর লাইটটাও কেউ নিবিয়ে দিল। বাড়িতে তো সে আর মা ছাড়া আর কেউ নেই। কিন্তু মা তার সাথে এরকম করবে কেন? হঠাৎই তার পুতুলটার ব্যাপারে খেয়াল হল। ওটাকে সে শুইয়ে রেখেছিল, কিভাবে যেন দাঁড়িয়ে পড়েছে। পুতুলটাকে ঠিকঠাক শুইয়ে সে নিজেও শুয়ে পড়ল। আবার কিছুক্ষণ আধা ঘুম আধা জাগা অবস্থা। হঠাৎ মনে হল ঘরের ঠিক মাঝখানে কেউ দাঁড়িয়ে রয়েছে। বেডল্যাম্পটা জ্বালিয়ে তড়াক করে বিছানায় উঠে বসল রিমি। কিন্তু কেউ নেই। একবার ভাবল মাকে ডাকবে। আবার একটু দ্বিধাবোধ করল। কি দরকার, বকাবকি করবে, সারাদিন অফিসে অজস্র কাজ করতে হয়। তারই মনের ভুল হবে। আবার সাহস করে শুয়ে পড়ল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে তার মনে হল, তার একদম ঘাড়ের কাছে কেউ নিঃশ্বাস ফেলছে। পাশ ফিরেই দেখল পুতুলটা একদম বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু তিনফুটের পুতুল যেন ছফুট লম্বা হয়ে গেছে আর তার মুখের অভিব্যক্তি যেন আরও হিংস্র হয়ে গেছে। আস্তে আস্তে সে রিমির দিকে এগিয়ে আসছে। গলায় যেন ফাঁসের মত কী একটা চেপে বসল। অন্ধকারের মধ্যে যেন আরও ঘন অন্ধকার নেমে আসছে। রিমির নিথর শরীরটা বিছানার ওপর এলিয়ে পড়ল।

পরের দিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে সুদেষ্ণার কেমন যেন একটা খটকা লাগল। রিমির স্কুলের দিনে কোনদিন তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতে হয় না, কিন্তু আজকে তো তার কোন সাড়াশব্দ নেই। রিমির ঘরের কাছে গিয়ে দেখল দরজাটা আলতো করে ভেজানো। একটু ঠেলা দিতেই পুরোপুরি খুলে গেল। রিমির নিষ্প্রাণ দেহটা এলিয়ে পড়ে রয়েছে বিছানায়। চোখগুলো যেন ঠেলে বেরিয়ে এসেছে আর তার গলাটা দুহাতে জড়িয়ে ধরে পুতুলটা যেন একটা পৈশাচিক হাসি হাসছে তার দিকে তাকিয়ে। একটা মর্মান্তিক আর্তনাদ করে সুদেষ্ণা মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।

Sunday, 27 May 2018

অভিশপ্ত ইঁদারা।

মনোজদের বাড়িটা বেশ পুরানো। প্রায় একশ বছরের কাছাকাছি বাড়িটার বয়েস। বাড়িটার পিছন দিকে একটা ইঁদারা বা বাঁধানো পাতকুয়া আছে। কিন্তু বহু বছর আর ওটা কেউ ব্যবহার করেনা। বাড়িটার কিছু ইতিহাসও আছে বটে। এই বাড়ির যিনি মালিক ছিলেন তার স্ত্রী সাংসারিক কারণেই হোক বা অন্য কোন কারণেই হোক ওই ইঁদারায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। তারপর ওই বাড়ির মালিক মনোজের ঠাকুরদাকে বাড়িটি বিক্রি করে দিয়ে চলে যান। কোথায় যান, তা আর জানা যায়নি বা কেউ জানার চেষ্টাও করেনি। ইঁদারার আশেপাশে এখন ঝোপঝাড় গজিয়ে গেছে। ওই দিকটা সবাই এড়িয়েই চলে। ওটা নাকি অশুভ। বহু বছর আগে মনোজের ঠাকুমা একবার জল তুলতে গিয়ে ভয়ংকর কিছু দেখে অজ্ঞান হয়ে যান। তার পর থেকে যে ক বছর বেঁচে ছিলেন, সে সময় তার মধ্যে কিছুটা অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা গেছিল। সব সময় বিড়বিড় করে কি বলতে থাকতেন, বোঝাই যেত না। 

মনোজ ছোটবেলা থেকেই বেশ সাহসী এবং যেকোনো অজানা ব্যাপারই তাকে ভীষণভাবে আকর্ষণ করে। এখন সে কলেজে পড়ে। মাকে একদিন খেতে বসে ইঁদারাটার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাও করেছিল কিন্তু মা তার দিকে এমনভাবে তাকাল যে সে আর দ্বিতীয় কথা বলার সাহস পায়নি। কিন্তু ভিতরে ভিতরে ইঁদারাটার ব্যাপারে জানার কৌতূহল তাকে কুরে কুরে খেয়েছে। একদিন সে এই ইঁদারার ব্যাপারটা ঠিক জানবে মনে মনে স্থির করল।


মনোজ সুযোগের অপেক্ষায় ছিল কবে বাড়িটা একটু ফাঁকা হবে। কিন্তু কিছুতেই সেই সুযোগ সে পাচ্ছিল না। বাড়িতে সব সময় লোক রয়েছে। অবশেষে সেই সুযোগ সে পেল। তাদের এক দুরসম্পর্কের আত্মীয়ের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান, বাড়ির সব লোকই নিমন্ত্রিত। সে না যাবার একটা ছুতো খুঁজছিল। হঠাৎই মাথায় একটা বুদ্ধি এল। সে মাকে বলল পেটটা বড় ব্যথা করছে, অতএব সে যেতে চায় না। তাছাড়া সামনে পরীক্ষাও আছে, তার জন্য কিছু পড়ার কাজ বাকি আছে। মা অনুমতি দিল বাড়িতে থাকার। ব্যাস, আর কি চাই? কিন্তু বাড়ির লোকেরা রওনা দিতে দিতে প্রায় সন্ধ্যে হয়ে যাবে। সুতরাং সন্ধ্যের আগে কিছু করা যাবে না। বাড়ির লোকেরা সব বেরিয়ে যেতেই সদর দরজায় তালা দিয়ে সে হাতে একটা টর্চ আর লাঠি নিয়ে ইঁদারাটার দিকে এগোল। লাঠি নেবার কারণ সাপখোপ থাকতে পারে, যা ঝোপঝাড়! ইঁদারার কাছে এসে তার মনে হল মৃদু গলায় তাকে কেউ যেন ডাকল। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না। কেউ তো এসময় থাকার কথাও নয়। অগত্যা সে ইঁদারার দিকে মনোনিবেশ করল। নিচে জল আছে, কিন্তু ভিতরে বাইরে সব জায়গায় শ্যাওলা পড়ে গেছে। আকাশে হালকা চাঁদের আলো রয়েছে, তাও সে টর্চটা জ্বালল। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, এই কদিন আগেই টর্চে ব্যাটারি ভরা হয়েছে, বার কয়েক টিমটিম করে জ্বলেই নিভে গেল। মনোজের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। সে তবুও সাহস সঞ্চয় করল এবং ইঁদারার নিচের দিকে তাকাল। আবছা আলোয় মনে হল তার নিজেরই প্রতিবিম্ব দেখতে পেল। কিন্তু প্রতিবিম্বটা যেন ক্রমশ বড় হচ্ছে আর উপর দিকেই উঠে আসছে। না, তার তো মাথায় এত বড় বড় চুল নেই আর মুখটাও এত ফ্যাকাসে নয়। এতো যেন কোন বয়স্ক মহিলার মুখ। অপলক দৃষ্টিতে মনোজের মুখের দিকে মুখটা তাকিয়ে রয়েছে। মুখের অভিব্যক্তি বর্ণনার বাইরে। মনোজের শরীরটা যেন শক্ত কাঠের মত হয়ে গেল, নড়াচড়া করার আর শক্তি নেই। হাত থেকে লাঠি আর টর্চ মাটিতে পড়ে গেল। হঠাৎ মহিলাটি তার দিকে হাত্টা বাড়াল। মনোজও মন্ত্রমুগ্ধের মত তার ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল। কি হিমশীতল সেই স্পর্শ! তার দেহটাকে কেউ যেন পালকের মত তুলে নিয়েছে এবং ইঁদারার ভিতরে টেনে নিচ্ছে। তার মাথাটা নিচে আর পাগুলো ওপরে। ঠাণ্ডা জল তার শরীরটাকে স্পর্শ করল। সে ডুবছে, ক্রমশ ডুবছে। গলায় যেন ফাঁসের মত কি চেপে বসছে। তার সব অনুভূতি যেন তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ জলের উপরিভাগে একটু আলোড়ন, তারপর কয়েকটা শুধু বুদবুদ ভেসে উঠল। চারিদিক নিস্তব্ধ এখন।

পরের দিন সকালে বাড়ির লোকেরা দরজা ভেঙে বাড়িতে ঢুকে মনোজকে খুঁজে না পেয়ে তটস্থ। অবশেষে ইঁদারার পাশে পড়ে থাকা লাঠি আর টর্চ দেখে তাকে খুঁজে পাওয়া গেল। রীতিমত দড়ি বেঁধে লোক নামিয়ে তার নির্জীব দেহটা তুলে আনা হল। সারা শরীরে যেন একফোঁটা রক্ত নেই, চোখগুলো যেন ভয়ংকর কিছু দেখে বিস্ফারিত হয়ে রয়েছে। পুরো বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে এল। পরে মনোজের বাবার নির্দেশে ইঁদারার মুখটা বন্ধ করে দেওয়া হল যাতে এই ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা আর না ঘটে।

Sunday, 1 April 2018

বন্ধ দরজা।

পাখির ছবি তোলা রণবীরবাবুর অনেকদিনের শখ। যখনই সুযোগ পান বেরিয়ে পড়েন তার নিকন ডি ৭০০০ ক্যামেরাটা পিঠে ঝুলিয়ে। দুর্দান্ত এস এল আর ক্যামেরা, পাখির ছবি তোলার জন্য একেবারে আদর্শ। সঙ্গে ৮০-৪০০ লেন্সও রাখেন। তার তোলা ছবি বিভিন্ন নামকরা বন্যপ্রাণী বিষয়ক পত্রিকায় ছাপা ও প্রশংসিত হয়। এইবারে খবর পেলেন বর্ধমান জেলার পূর্বস্থলীর চুপি চরে নানারকম বিদেশী পরিযায়ী পাখি আসে। অতএব পূর্বস্থলী যেতেই হচ্ছে। সকালবেলা বিধাননগর স্টেশন থেকে কাটোয়া লোকাল ধরলেন। পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় দুপুর হয়েই গেল। পৌঁছে স্টেশনের কাছেই একটা ছোটখাটো হোটেলে দুটো খেয়ে নিলেন। স্টেশন থেকে চুপি চর যাবার ভ্যান রিকশা ভাড়া পাওয়া যায়, তারই একটা নিয়ে রওনা দিলেন। পথেই রিকশাওয়ালার মুখে জানতে পারলেন, পাখির ছবি তোলার একদম আদর্শ সময়ে (জানুয়ারি মাস) এসেছেন। চুপি চরে পৌঁছে দেখলেন পাখির ছবি তোলার উৎসাহী লোকজনের অভাব নেই। নৌকায় উঠে তিনিও ফটো তুলতে মগ্ন হয়ে পড়লেন। বিভিন্ন ধরনের পাখি, তাদের বিভিন্ন রকমের আচার আচরণ, খুবই মনমুগ্ধকর। ফটো তুলতে তুলতে সময় যে কি ভাবে কেটে গেল, টেরই পেলেন না। হঠাৎই খেয়াল হল যে বিকেল হয়ে এসেছে, বাড়ি ফিরতে হবে। তড়িঘড়ি মাঝিকে বলে নৌকা পারে লাগিয়ে নেমে পড়লেন। শিয়ালদা কাটোয়া লোকাল অনেকক্ষণ বাদে বাদে ট্রেন, মিস করলে আজকে আর বাড়ি ফিরতে পারবেন না। একটা ভ্যান রিকশা ভাড়া পেয়ে গেলেন, উঠেই বললেন, “স্টেশন, একটু তাড়াতাড়ি চলো ভাই।“ উত্তরে রিকশাওয়ালা বিড়বিড় করে কি বলল, বোঝা গেল না। মুখটা যেন একটু বেশি রকমই কাপড় দিয়ে ঢাকা।

রিকশা চলছে তো চলছেই, পথ যেন আর ফুরায় না। রণবীরবাবুর অবাক লাগল। চুপি চর থেকে পূর্বস্থলী স্টেশন অল্প কিছুক্ষণের পথ, এতো সময় কেন লাগবে? কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর জিজ্ঞাসা করলেন, “ও ভাই, স্টেশন এত সময় লাগছে কেন? রাস্তা ভুল করলে নাকি?” কোন উত্তর নেই। একটা অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করলেন, কিছুক্ষণ আগে ডানদিকে একটা মন্দির ছেড়ে এসেছিলেন, আবার সেই মন্দিরটা সামনে দেখা যাচ্ছে। একই রাস্তায় বারবার করে ঘুরছেন নাকি? ভয়ে শিউড়ে উঠলেন। আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “ও ভাই, কি হল, রাস্তা ভুল করলে নাকি?” রিকশাওয়ালা নির্বাক। হঠাৎই একটা ঝটকা দিয়ে রিকশাটা দাঁড়িয়ে পড়ল। রণবীরবাবু বলে উঠলেন, “কি হল? হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লে যে?” ভাঙা ভাঙা গলায় জবাব এল, “চেন পড়ে গেছে বাবু, রিকশা আর যাবে না।“ রণবীরবাবু দেখলেন মহা বিপদ। জিজ্ঞাসা করলেন, “এখান থেকে স্টেশন কিভাবে যাব?” রিকশাওয়ালা মুখে কিছু না বলে একটা মেঠো পথ দেখিয়ে দিল। অগত্যা কোন উপায় না দেখে সেই পথ ধরেই হাঁটতে শুরু করলেন। একটু গিয়ে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখলেন রিকশাওয়ালা তাঁর রিকশা সমেত অদৃশ্য হয়ে গেছে। ভয়ে বুকটা কেঁপে উঠল তার। সামনে তাকিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। অনেক দূরে দূরে একটা করে আলো, অল্প বাড়িঘর, কিন্তু বড্ড নির্জন। কিছুক্ষণ পরে একটা পোড়ো বাড়ির সামনে এসে পৌঁছলেন। খুবই পুরনো বাড়ি, চারিদিকে কাঠের বেড়া দেওয়া। ঢুকেই আঁতকে উঠলেন। বাড়ির আশেপাশে বেশ কিছু মড়ার খুলি ও কাঠের পোড়া আসবাবপত্রের টুকরো ছড়ানো। তাড়াতাড়ি গেট খুলে বাইরে এসে আবার দ্রুতগতিতে হাঁটতে শুরু করলেন। কিছুক্ষণ গিয়ে আবার দেখলেন একটা পোড়ো বাড়ি। আরে, এই বাড়িটা তো আগের বাড়িটার মত হুবহু এক দেখতে। গেট খুলে সেই মড়ার খুলি ছড়ানো দেখে আবার দ্রুতগতিতে বেরিয়ে আসা, পথ চলতে থাকা। পরপর চার পাঁচবার রণবীরবাবুর একই অভিজ্ঞতা হল। সারা শরীর এই শীতকালে ঘামে ভিজে চপচপ করছে, পিঠে কামেরার ব্যাগটা মনে হচ্ছে যেন এক মণ ওজন। পাগুলো যেন অবশ হয়ে আসছে। আবার সেই পোড়ো বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন। বাড়িটা যেন তাকে চুম্বকের মত টানছে। মড়ার খুলিগুলো পেরিয়ে একটা দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। একটু ঠেলতেই দরজাটা খুলে গেল। কিছুটা এগিয়ে আবার একটা দরজা। একটু ইতস্তত করলেন। মনের মধ্যে কে যেন বলে উঠল, “খুলিস না, দরজাটা খুলিস না।“ দেখলেন দরজার তলা দিয়ে যেন পাকিয়ে পাকিয়ে ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে। কিন্তু তবুও দরজাটা খুলে ফেললেন। খুলে দেখলেন এক ভয়ংকর দৃশ্য। সারা ঘরে লেলিহান আগুনের শিখা এবং তার মধ্যে একটি যুবতী মেয়ে আগুন থেকে বাঁচবার জন্য আর্তনাদ করছে। কি মর্মান্তিক ও ভয়ংকর সে দৃশ্য! রণবীরবাবু যেন কিংকর্তব্যবিমূড় হয়ে পড়লেন। আচমকা আগুনের শিখা রণবীরবাবুর দিকেও ধেয়ে এল। পালাতে গিয়েও পালাতে পারলেন না। যুবতী মেয়েটি যেন তাকে হাত ধরে টানতে লাগল। সারা শরীরে যেন উত্তপ্ত লোহার ছ্যাঁকা লাগছে। আর্তস্বরে চিৎকারে ঘরটি যেন কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল। লেলিহান অগ্নিশিখা ক্রমশ দুজনকেই গ্রাস করল। মেঝে্তে পড়ে রইল শুধু একরাশ ছাই, দুটি মড়ার খুলি ও কিছু হাড়গোড়।
পুনশ্চঃ ওই বাড়িতে বহুবছর আগে আগুন লেগে বেশ কিছু লোকের প্রাণহানি হয়েছিল।

Saturday, 17 March 2018

কাবেরী।

স্ত্রীর মৃতদেহটা আঁকড়েই বসে ছিল পরিমল। দীর্ঘ পাঁচ বছর ক্যানসারে ভোগার পরে আজই ছিল তার জীবনের শেষ দিন। ডাক্তাররা অবশ্য অনেকদিন আগেই জবাব দিয়ে দিয়েছিলেন। এই মারণরোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া খুবই কঠিন। তবুও আশা ছাড়েনি পরিমল। কিন্তু.........

বন্ধুরা এসে ডাকাডাকি করাতে হুঁশ হল তার। এই ভাবে তো বসে থাকলে চলবে না। শ্মশানে গিয়ে শেষকৃত্যের কাজ করতে হবে।

শ্মশানে চিতাতে যখন কাবেরীর দেহটা তিলে তিলে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে, তখনও একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল পরিমল। মানুষের জীবন কত অনিশ্চিত, সেটাই হয়ত ভাবছিল। সে নিঃসন্তান, অতএব বাকি জীবনটা তাকে একাকিত্বের মধ্যেই কাটাতে হবে। পারবে কি সে?

বাড়িতে ফিরে এসে কিছুই ভালো লাগছিল না তার। চুপ করে ড্রয়িং রুমের সোফাটায় বসে ছিল। সাধারণত সে বেশি ধূমপান করে না, কিন্তু আজ পুরো দু প্যাকেট শেষ করে ফেলেছে। আজ খেতেও ইচ্ছা করছে না তার। আস্তে আস্তে উঠে বিছানায় শুয়ে পড়ল। ঘুম আসছে না......

কাবেরীর সঙ্গে তার আলাপ কলেজ জীবন থেকে। বহুদিনের সম্পর্ক তাঁদের এবং আগাগোড়াই বড় মধুর। তাদের জীবনে হয়ত স্বচ্ছলতার অভাব কখনো সখন অনুভূত হয়েছে, কিন্তু আনন্দের কোন অভাব ছিল না।     

আস্তে আস্তে ঘুমে চোখ জড়িয়ে এল পরিমলের। সারাদিনের শ্রান্তির ফলেই হয়ত। হঠাৎ যেন মনে হল তাকে কেউ ডাকল। স্ত্রীলোকের গলার আওয়াজই মনে হল তার। ঠিক ব্যাপারটা বুঝতে পারল না সে। এতো রাতে তাকে কে ডাকবে? ওই আবার! "পরিমল, পরিমল......।" ঘাড় ঘুরিয়ে বারান্দার দরজাটার দিকে তাকাল সে। একি দেখছে সে? সাদা কাপড় পরা কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। এতো কাবেরী দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু তাও কি করে সম্ভব? সে তো আজকে নিজে তাকে দাহ করে ফিরেছে। এ কীরকম তার রূপ? মুখের কাছটা কিছুটা বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু শরীরের বাকি অংশটার মধ্যে দিয়ে বারান্দার রেলিংগুলো দেখা যাচ্ছে। ছায়ামূর্তি বলে উঠল, "আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না পরিমল। তাই তোমার সঙ্গে দেখা করতে এলাম। কিন্তু আমার উপায়ও নেই। আমাকে যেতে হবে। তবুও আমি আসব, মাঝে মধ্যে তোমার সঙ্গে দেখা করে যাব।" পরিমল বাকরুদ্ধ হয়ে রইল। হঠাৎই তার খেয়াল হল, কাবেরীর অশরীরী ছায়ামূর্তিটা যেন বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। সে ডেকে উঠল, "কাবেরী, কাবেরী, যেও না, দাঁড়াও।" উত্তর ভেসে এল, "আমি আবার আসব, তুমি যতদিন না নিজে থেকে আমার কাছে আসছ।" কাবেরীর অশরীরী ছায়ামূর্তিটা বাতাসে মিলিয়ে গেল।

বেশ কিছুক্ষণ থম মেরে বিছানায় বসে থাকার পর পরিমলের খেয়াল হল, ভোর হয়ে এসেছে।

Saturday, 10 March 2018

খারিজ।

মনটা বড়ই বিষণ্ণ হয়ে পড়ল প্রসেনজিতের। ঢাকুরিয়া লেকের একটা বেঞ্চিতে বসে রয়েছে সে। চারিদিকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঝিলের ফুরফুরে হাওয়া, কিছুই তাকে আর আকর্ষণ করছে না। কিছুদিন আগেও সে প্রমিতার সঙ্গে এই বেঞ্চিতেই পাশাপাশি বসেছিল। তখন পরিস্থিতি ছিল একরকম। এখন...... পুরোপুরিই অন্যরকম। এতো বছরের প্রেম আর ভালবাসার এই প্রতিদান? পারল কি করে প্রমিতা, যাকে সে নিজের জীবনের থেকেও বেশি মনে করে এসেছে?
কাল রাত্রেই ফোনটা এসেছিল। “সরি প্রসেনজিৎ, এতোদিন আমাদের মধ্যে যা হয়ে এসেছে, সেটা প্লিজ ভুলে যাও। আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। আর আমি বাবার মতের বিরুদ্ধে যেতে পারব না।“ কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ফোনটা কেটে দিয়েছিল। রিং ব্যাক করা সত্ত্বেও আর রিসিভ করেনি।
সন্ধ্যে ঘনিয়ে এল। আস্তে আস্তে ঢাকুরিয়া লেক ফাঁকা হয়ে আসছে। তবুও বসে রইল সে। মনের ভিতরে যে ধিকি ধিকি আগুন জ্বলছে, সেটা কিছুটা প্রশমন করতেই বোধহয়। কিন্তু সময় যতই কাটছে, আগুন নেভা তো দুরের কথা, আস্তে আস্তে সেটা যেন একটা দাবানলের রুপ নিচ্ছে। না, এতদিন সে যাকে এতো ভালবেসে এসেছে, তাকে অন্য কেউ পাবে, এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারবে না। দরকার হলে সেই অন্য পুরুষকে সে এই দুনিয়া থেকে......
প্রায় সাতটা বাজতে চলল। ঝোলাব্যাগটা আলগোছে কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে প্রসেনজিৎ ঢিমেতালে বাড়ির দিকে এগিয়ে চলল। হঠাৎ সে এতোটা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে পড়েছে, সে যেন এটা নিজেই বিশ্বাস করতে পারছে না। ভালবাসায় আঘাত হয়ত তাকে নৃশংস করে তুলছে, তার ভিতরের আদিম রিপুটাকে জাগিয়ে তুলছে।

দুএকদিনের মধ্যেই প্রমিতার হবু বরের ব্যাপারে সবই জানতে পারল প্রসেনজিৎ। প্রমিতাদের হাউসিং কমপ্লেক্সেই সে থাকে এবং তার বাবা ও প্রমিতার বাবা বাল্যবন্ধু। বিদেশ থেকে ম্যানেজমেন্ট পাশ করে আসা ছেলে, এখানেই কোন একটি নামকরা প্রাইভেট ব্যাঙ্কে উচ্চপদস্থ র‍্যাঙ্কে চাকরি করে। এই জন্যেই কি প্রমিতা তার সঙ্গে এইরকম করল? সে একটা বেসরকারি স্কুলে পার্ট-টাইম টিচার বলেই কি তার সঙ্গে এই রকম হল? তাহলে কি পুরো ব্যাপারটাই প্রেমের নাটক?
সে ঠিক করেই ফেলেছে কি করবে। আর দুয়েক মাসের মধ্যেই বিয়ে, আর প্রমিতা তার হবু স্বামীর সঙ্গে নাকি প্রায়ই শপিঙে বেরোচ্ছে। শুধু একটু সুযোগের অপেক্ষা। পাড়ার এক কুখ্যাত গুণ্ডার থেকে অ্যাসিড বাল্বটা সে জোগাড় করে ফেলেছে। তবে জায়গাটা একটু নির্জন না হলে হবে না। ধরা পড়ে যাবার ভয় আছে।     
সুযোগটা একদিন হাতে নাতেই পেয়ে গেল প্রসেনজিৎ। রাসবিহারী থেকেই দুজনকে অনুসরণ করছিল সে। বিবেকানন্দ পার্কের কাছটা সন্ধ্যের পর অনেকটাই নির্জন হয়ে যায়। ভাড়া করা বাইকটা কাজ হাসিল হওয়ার পর পালিয়ে যেতে কাজ দেবে। হেলমেট পরে রয়েছে, সুতরাং তাকে কেউ চিনতে পারবে না। আরেকটু, আরেকটু কাছে আসুক দুজনে। লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে পুরো উদ্দেশ্যটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে। ব্যাস, দুজনেই একদম সামনে এসে পড়েছে। আর দেরি নয়। অ্যাসিড বাল্বটা সাইডব্যাগ থেকে বার করে বিদ্যুৎবেগে সে প্রমিতার হবু স্বামীর মুখে ছুঁড়ে মেরেই আর দাঁড়াল না। নারী পুরুষের সম্মিলিত চিৎকারে চারিদিকের বাতাস ভারি হয়ে উঠল। কিন্তু সে কর্ণপাত না করে ঝড়ের বেগে বাইক চালিয়ে অকুস্থল থেকে বেরিয়ে গেল।               
সপ্তাহ দুই পরের কথা। কাগজের এক কোণায় প্রমিতার হবু স্বামীর মৃত্যুসংবাদটা বেরিয়েছে। বহু চেষ্টা করেও ডাক্তাররা তাকে বাঁচাতে সক্ষম হননি। পুলিস হন্যে হয়ে খুনিকে খুঁজছে কিন্তু এখনো সফল হয়নি। মনে একটা অদ্ভুত পরিতৃপ্তি অনুভব করল প্রসেনজিৎ। এই আনন্দে সে আজ প্রচুর পান করবে। শহরের এক নামকরা পানশালাতে ঢুকে নিজের পছন্দমত ড্রিঙ্কসের অর্ডার দিল সে। মনের আনন্দে পান করে চলল। পান করতে করতে ঘড়ির কাঁটার দিকে খেয়ালই নেই। পানশালার মালিক দুএকবার তাড়া লাগিয়ে যখন বলল যে বন্ধ করার টাইম হয়ে গেছে তখন তার খেয়াল হল। টলতে টলতে সে বাড়ির পথে রওনা হল। আস্তে আস্তে সে সেই জায়গাটায় পৌঁছল যেখানে সে অ্যাসিড বাল্বের হামলা করেছিল। পার্কের রেলিঙের ওপর ভর দিয়ে একটু দাঁড়াল সে। একটু দম নিল। দূরে কে যেন একটা আসছে। পাত্তা দিল না সে। কিন্তু লোকটা যেন তার দিকেই এগিয়ে আসছে। কাঁধে একটা সাইডব্যাগও মনে হচ্ছে আছে। নেশার্ত চোখে সে মুখটা বোঝার চেষ্টা করল। একি? এতো প্রমিতার হবু স্বামীর মুখ, একেবারে অবিকল। কি করে হয়? সে তো মারা গেছে, আজকের কাগজ তো তাই বলছে। কিছু বোঝার আগেই তরল আগুনের মত কিছু যেন তার মুখে কেউ ছুঁড়ে মারল।  উফফ, অসহ্য, অবর্ণনীয় যন্ত্রণা। চারিদিক আস্তে আস্তে অন্ধকার হয়ে গেল প্রসেনজিতের কাছে।               
দুই সপ্তাহ পরের কথা। কাগজের এক কোণায় প্রসেনজিতের মৃত্যুসংবাদটা বেরিয়েছে। যমে মানুষে লড়াই করেও ডাক্তাররা তাকে বাঁচাতে সক্ষম হননি। পুলিস হন্যে হয়ে খুনিকে খুঁজছে কিন্তু এখনো কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।

Monday, 5 March 2018

অভিশপ্ত বাংলো।

বাংলোবাড়িটায় ওরা নতুনই এসেছে। ওরা বলতে জয়িতা, তার বাবা মা, ছোট ভাই শুভাশিস এবং পোষা আলসেশিয়ান টমি। জয়িতার বাবা ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, বদলির চাকরি, তাই বদলি হয়ে এখানে এসেছেন। জয়িতা ও তার ভাই দুজনেই স্কুলে পড়ে, চার বছরের ছোট বড়। কিন্তু যবে থেকে তারা এখানে এসেছে, কিছু একটা অশুভ ছায়া যেন তাদের তাড়া করে ফিরছে। তারা যখন গাড়ি থেকে নেমে বাংলোতে ঢুকছিল, একটা আধপাগলা লোক পাশ দিয়ে বলতে বলতে বেরিয়ে গেল, “এ বাড়িতে এসেছ তোমরা? চলে যাও, এখুনি চলে যাও, মরবে, এ বাড়িতে থাকলেই সব মরবে!” সবার মনে যেন একটা অশুভ ইঙ্গিত খেলে গেল।
একদিন শুভাশিস দিদিকে বলল, "দিদি, তুই এখানে রাত্রিবেলা কোন আওয়াজ শুনতে পেয়েছিস?" জয়িতা বলল, "কই নাতো?" শুভাশিস কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলল, “আমি যেন রাত্রিবেলা কারো কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলাম। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেউ কাঁদছে।“ জয়িতা বলল, “দুর বোকা, ও তোর মনের ভুল।“ ব্যাপারটা আর বেশিদুর গড়াল না।
একদিন বাজার করতে গিয়ে জয়িতার বাবার সঙ্গে এক ভদ্রলোকের আলাপ হল। ওদের বাংলো ছাড়িয়ে গেলে একটা মাঠ পড়ে, তার পাশেই ওনার বাড়ি। কথায় কথায় বাংলোটার প্রসঙ্গ এসেই গেল। ওরা ওই বাংলোতে উঠেছে শুনেই ভদ্রলোক যেন একটু থম মেরে গেলেন। জয়িতার বাবা কারণ জিজ্ঞাসা করাতে তিনি একটু ইতস্তত করে বললেন, “ওই বাড়িতে বহু বছর আগে একটা খুন হয়। স্ত্রীর সঙ্গে পরপুরুষের সম্পর্ক আছে সন্দেহে স্বামী স্ত্রীকে খুন করে। এর কিছুদিন পরে স্বামীরও অজ্ঞাত কারণে মৃত্যু হয়। এর পর যারা যারাই ওখানে থেকেছে, তাদেরই কোন না কোনভাবে অপঘাতে মৃত্যু হয়েছে। ও বাড়ি ভাল নয় মশাই, অভিশপ্ত।“ বলেই ভদ্রলোক জোর পায়ে হাঁটা দিলেন। জয়িতার বাবা চিন্তাচ্ছন্ন মনে বাড়ি ফিরে এলেন। তবে কাউকে কিছু বললেন না।     

আরেকদিনের কথা। পরের দিন কেমিস্ট্রি পরীক্ষা, একটু বেশি রাত জেগেই পড়ছে জয়িতা। পড়ার ঘরের পাশে একটা বারান্দা, লাগোয়া একটা জানলাও আছে। হঠাৎই মনে হল, বারান্দা দিয়ে একটা ছায়ামূর্তি চলে গেল। এতো রাতে বাড়ির আর তো কেউ জেগে থাকার কথা নয়। চট করে বারান্দায় গিয়ে দেখল কেউ নেই। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার যেন একটা আওয়াজ আসছে। গায়ে কাঁটা দিল জয়িতার। তাড়াতাড়ি সে নিজের ঘরে ফিরে গেল।
পরের দিন সকালে প্রাতরাশ করতে করতে সকলের খেয়াল হল, টমি তো নেই। খোঁজ খোঁজ রব পড়ে গেল। খুঁজতে খুঁজতে বাগানের এককোণে ঝোপের নিচে টমির মৃতদেহটা পাওয়া গেল। অতবড় কুকুরটার কে যেন ঘাড়টা মটকে দিয়েছে। অশুভ একটা ইঙ্গিতে সবার যেন গা ছমছম করে উঠল। শুভাশিসের খুবই প্রিয় ছিল টমি, স্কুল থেকে এসেই তার সঙ্গে খেলা তার চাইই চাই। কাঁদতে কাঁদতে বলল, “টমির এই অবস্থা কে করল? ও কার কি ক্ষতি করেছিল?” কারো কাছেই কোন সদুত্তর নেই।
পরের দিন জয়িতার বাবা অনেক রাত অবদি জেগে কিছু অফিসের কাজ করছিলেন। তার স্টাডির লাগোয়া একটা বারান্দা আছে এবং ঘরটা তিনতলায়। হঠাৎ তার মনে হল বারান্দায় কেউ দাঁড়িয়ে আছে। এই সময় তো বাড়ির কেউ এখানে থাকার কথা নয়। ভয়ে তার গাটা ছমছম করে উঠল। একই সঙ্গে কৌতূহলও হল। তিনি কাজের ডেস্ক থেকে উঠে বারান্দায় গেলেন। কই, কেউ নেই তো? একটু এগিয়ে রেলিংএর কাছটায় গেলেন। হঠাৎ মনে হল পিছনে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে। পিছু ফিরে দেখতে যাবেন, কে যেন তাকে একটা জোর ধাক্কা মারল। রেলিঙটা নিচু, তার শরীরটা একটা পাক খেয়ে শক্ত মাটিতে আছড়ে পড়ে একটু নড়েচড়েই স্থির হয়ে গেল।
পরের দিন বাড়ির অবস্থাটা চিন্তা করাই যায়। সবাই শোকস্তব্ধ, শোকসন্তপ্ত। বাবার শেষকৃত্য সম্পন্ন করে এটাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হল যে এই বাড়িতে আর এক মুহূর্তও থাকা চলবে না। কোনরকমে একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে এখান থেকে চলে যেতে হবে। কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস আপাতত নেওয়া হবে, বাকি পরে ব্যবস্থা করা যাবে। গাড়ি আসতে আসতে প্রায় সন্ধ্যেই হয়ে গেল। পুরোনো অ্যামবাসাডার গাড়ি, ধীরে ধীরে চলছে। ড্রাইভারের মুখটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। জয়িতা অধৈর্য হয়ে বলে উঠল, “আপনি গাড়িটা প্লিজ জোরে চালান, আমাদের ট্রেন ধরতে হবে।“ ড্রাইভারের কোন ভাবান্তর নেই। হঠাৎই গাড়িটা একটা অজানা রাস্তা দিয়ে চলতে শুরু করল। কিছুক্ষণ চলার পরে একটা জঙ্গলের কাছে এসে গাড়িটা দাঁড়িয়ে পড়ল। ড্রাইভার তাদের দিকে মুখ ফেরাল। ওরকম বীভৎস মুখ তারা জীবনে দেখেনি। মুখটা যেন সাদা কাগজের মত ফ্যাকাসে, তাতে রক্তবর্ণ দুটো চোখ। ড্রাইভার বলল, “আপনারা পৌঁছে গেছেন।“ বলে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে যেন হাওয়ায় অদৃশ্য হয়ে গেল। হঠাৎই মনে হল গাড়িটাকে কেউ ঠেলছে। কিন্তু পিছন দিকে তাকিয়ে তারা কাউকে দেখতে পেল না। দরজা খোলার চেষ্টাও বৃথা হল। আচমকা গাড়িটা যেন কিছুটা নিচের দিকে গোঁত্তা খেয়ে নেমে গেল এবং জলে কিছু পড়লে ঝপাং করে যেমন আওয়াজ হয় তেমনই একটা আওয়াজ হল। তবে কি গাড়িটা একটা পুকুরে পড়ল? তারা তো কেউই সাতাঁর জানে না। আর সাতাঁর জেনেও বা লাভ কি, প্রাণপণ চেষ্টাতেও গাড়ির দরজা খোলা সম্ভব হচ্ছে না। আস্তে আস্তে জলের রেখা গাড়ির জানলা ছাড়িয়ে উঠতে শুরু করল, ডুবছে, গাড়ি ডুবছে, চারিদিকে যেন একটা হিমশীতল স্তব্ধতা, শেষ মুহূর্তে শুধু কয়েকটা মর্মান্তিক আর্তনাদ। কয়েকটা বুদবুদ ছড়িয়ে দিয়ে গাড়িটা পুরোপুরি পুকুরের জলে তলিয়ে গেল।

Sunday, 25 February 2018

বর্ষার সেই রাত।

ছোটবেলা থেকেই অর্ণবের স্বপ্ন ছিল সে ডাক্তার হবে। পড়াশোনায় সে খুব ভালো ছিল বলে সেই স্বপ্ন তার পূরণও হয়েছে। মেডিক্যাল কলেজ থেকে সে খুব ভালো নম্বর পেয়ে সে এমবিবিএস পাশ করেছে। কিন্তু এবার ইন্টার্নশিপের জন্য তাকে এক বছর কলকাতার বাইরে কোন হাসপাতালে গিয়ে কাজ করতে হবে। ক্যানিং এর বাসন্তী ব্লকে তার পোস্টিং পড়ল। তল্পিতল্পা গুটিয়ে সে রওনা হল। নতুন হাসপাতালের দায়িত্ব তার ভালই লাগল। সিনিয়ররা এবং সহকর্মীরা বেশ ভালো। গ্রামের লোকজনেরও ডাক্তারবাবুদের ওপর অগাধ বিশ্বাস। অল্প কয়েকমাসের মধ্যেই গ্রামবাসীদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠল অর্ণব। গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মাঝে মধ্যেই তাকে বসতে হয় এবং তার কাছে জ্বরজারি বিবিধ সমস্যা নিয়ে লোকেরা আসে এবং সে সাধ্যমত তাদের রোগ নিরাময়ের চেষ্টা করে। এইভাবে চলছিল বেশ। কিন্তু হঠাৎই এমন একটা ঘটনা অর্ণবের জীবনে ঘটল যুক্তিতে যার কোন ব্যাখা মিলবেনা।

বর্ষাকাল চলছে। সারাদিন ধরেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। সন্ধেবেলা ডিউটি থেকে ফিরে অর্ণব একটু মুড়ি চানাচুর নিয়ে বসেছে, হঠাৎই সদর দরজাটা কে যেন সজোরে ধাক্কাতে আরম্ভ করল, "ডাক্তারবাবু, বাড়িতে আছেন? দয়া করে দরজাটা খুলুন।" অর্ণব খুব বিরক্ত বোধ করল। সারাদিনের পরিশ্রমের পর একটু বিশ্রামের অবকাশ, তাও উপায় নেই। সে বলল, "আমি খুবই ক্লান্ত। তাছাড়া আমাদের হাসপাতালের বাইরে প্র্যাকটিস করা নিয়ম নেই, আপনি এখন যান।" কিন্তু নাছোড়বান্দা কণ্ঠস্বরটি বলল, "হুজুর, একবার চলুন, আমার বাবার ধুম জ্বর, কিছুতেই কমছে না। বাড়ি বেশি দূর না, আর কাউকে পেলাম না বলে আপনার কাছেই এলাম।" অর্ণব আরও দুএকবার আপত্তি করল, কিন্তু লোকটি কিছুতেই শুনল না। অগত্যা সে দরজাটা খুলল। দরজা খুলতে না খুলতেই কড়কড়াত শব্দে একটা বাজ পড়ল। বিদ্যুতের ঝলকানিতে যেটুকু দেখতে পেল তাতে মনে হল রোগাপাতলা চেহারার একটি মাঝবয়সী গ্রাম্য লোক, আপাদমস্তক চাদরে ঢাকা, মুখটাও ভালো করে খেয়াল করা যাচ্ছে না। সে চট করে একটা ছাতা আর তার ডাক্তারি সরঞ্জামের ব্যাগটি সঙ্গে নিয়ে লোকটির পিছন পিছন চলতে লাগল। একে তো অন্ধকার গ্রামের রাস্তা, তার ওপর ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছে, যেন সামনের লোকটি অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। লোকটি এতো দ্রুতগতিতে হাঁটছে যে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পারছে না, খালি পিছিয়ে পড়ছে। তখন একটু হাঁকডাক দিয়ে  নিশ্চিত হচ্ছে যে লোকটি সঙ্গে আছে। বেশ কিছুটা পথ চলার পরে দূরে যেন একটা চালাঘর দেখা গেল। পথপ্রদর্শক লোকটি বলল, "ডাক্তারবাবু, আমাদের বাড়ি এসে গেছে।" আবার একটা বাজ পড়ল। বিদ্যুতের ঝলকানিতে যেটুকু দেখা গেল, লোকটি আর তার পাশে নেই। চমকে গিয়ে অর্ণব ডাকতে লাগল, "ও মশাই, কোথায় গেলেন, ও মশাই?" লোকটি যেন ভ্যানিশ হয়ে গেছে মুহূর্তের মধ্যে। বাধ্য হয়েই সে এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে না দেখতে পেয়ে চালাঘরটির দিকেই এগোতে লাগল। চালাঘরটির কাছে পৌঁছে দেখল যেন বিছানায় কেউ শুয়ে রয়েছে এবং আশেপাশে আরও কয়েকটি ছায়ামূর্তি ঘোরাফেরা করছে। অন্ধকারে কারোরই মুখ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। অর্ণবকে দেখে কে যেন বলে উঠল, "বড় দেরি করে ফেললেন ডাক্তারবাবু, আর বোধহয় বাঁচবে না।" মহিলার গলায় একটা বুকফাটা কান্নার আওয়াজ শোনা গেল। অর্ণবের কাছে সবই যেন কেমন ধোঁয়াশার মত লাগছে, তবুও একজন ডাক্তারের কর্তব্য পালনার্থে সে রোগীর পাশে বসে তার নাড়িটা দেখার চেষ্টা করল। কিন্তু একি? চাদরের তলা থেকে যে হাতটি সে তুলে ধরল, তার স্পর্শ এত ঠাণ্ডা কেন? এতো রক্তমাংসের হাত নয়। এতো কংকালের হাত! আর তার চারপাশে কারা ভিড় করে এগিয়ে আসছে? এরা কি মানুষ? মানুষ এমন হয়? মনে হচ্ছে গায়ে চাদর জড়ানো একদল কংকাল, শুধু খুলিগুলো দেখা যাচ্ছে। সেগুলো যেন বীভৎসভাবে হাসতে হাসতে অর্ণবের দিকে চেয়ে বলছে, "আর তোর রক্ষা নেই, আজ আর তুই বাঁচলি না।" ছায়ামূর্তিগুলোর অন্ধকার তাকে পুরোপুরি গ্রাস করার আগেই অর্ণব জ্ঞান হারাল। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যেন এখন আরও জোরে জোরে পড়ছে।

পরের দিন সকালে গ্রামবাসীরা অর্ণবের মৃতদেহটা উদ্ধার করল। সারা শরীরে যেন এক ফোঁটাও রক্ত অবশিষ্ট নেই, কেউ যেন শুষে নিয়েছে। চোখগুলো যেন মরার আগের মুহূর্তে ভয়ংকর কিছু দেখে ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে। বহু বছর আগে ওই একই দিনে ওই জায়গায় বেশ কিছু লোক মহামারীতে মারা গেছিল। তারপর থেকে নাকি জায়গাটা অভিশপ্ত।