Pages

Finance and Travel Ideas

Tuesday, 16 October 2018

কাজলদিঘির অপদেবতা।

গ্রামের নাম নিশ্চিন্দিপুর। খুবই সুন্দর একটি গ্রাম, পাহাড়ের কোলে সবুজিমা দিয়ে ঘেরা। গ্রামে চার পাঁচশ লোকের বাস। শান্তিতেই বসবাস করছিল সব, কোন ঝুটঝামেলা নেই। কিন্তু গত কয়েকবছর ধরে গ্রামে শুধু একটাই সমস্যা, আর সেইটা কাজলদিঘি সম্পর্কিত।

এই প্রসঙ্গে কাজলদিঘির ব্যাপারে একটু বলে নেওয়া প্রয়োজন। এটি বহু বছর আগে খোঁড়া একটি মনুষ্যসৃষ্ট দিঘি। দিঘির আয়তন বিশাল, এপার থেকে ওপার হতে বেশ সময় লাগে। দিনের বেলা লোকে মাছ ধরে, সাঁতার কাটে, কোন ভয়ের ব্যাপার নেই। কিন্তু রাতের বেলা ওই পানে যাওয়া বারণ। কেন?

শোনা যায়, বহু বছর আগে গ্রামে এক বিধবা মহিলা বাস করত। তার নাম ছিল রেবা। সুতো কেটে, কাপড় সেলাই করে দিন গুজরান করত। খুবই অভাবের মধ্যে সংসার চলত। হঠাৎই একদিন রাতে সে নিখোঁজ হয়ে গেল। পরের দিন সকালে কাজলদিঘিতে তার দেহটা ভেসে ওঠে। শরীরটা জল খেয়ে ফুলে উঠেছে। চোখ দুটো যেন ভয়ংকর কিছু দেখে বিস্ফারিত। আত্মহত্যা না খুন, কিছুই জানা যায় না। কিছু দিন পর ব্যাপারটা ধামাচাপা পড়ে গেল।

এই ঘটনার পর থেকেই কাজলদিঘিতে কিছু কিছু অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করতে থাকে এলাকার মানুষজনেরা। রাত্রিবেলা স্ত্রীলোকের গলায় কান্নার আওয়াজ অনেকেই নাকি শুনতে পায়। এলাকায় একবার ভুমিকম্প হয়। এলাকায় অন্যান্য যে দিঘিগুলি রয়েছে, সেগুলোর জলে কম্পন তো দেখা যাচ্ছিল, কিন্তু কাজলদিঘির জল যেন এপাশ ওপাশ হচ্ছে। এইরকম আলোড়ন খুব কমই দেখা যায়। অন্য দিঘিগুলোর জল স্থির হয়ে যাবার পরেও যেন কাজলদিঘির জল যেন থির থির করে কাঁপছিল। এলাকার লোকজন বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ল। সবাই ঠিক করল যে পাশের গাঁয়ের রামেশ্বর গুণিনের শরণাপন্ন হবে।

রামেশ্বর গুণিন বাকসিদ্ধ এবং তন্ত্রসিদ্ধ গুণিন। চার পাঁচটা গ্রাম মিলিয়ে তার খুব নামডাক। ঝাড়ফুঁক, ভূত তাড়ানো, বাণ মারা, অপদেবতা থেকে মুক্তি, সবেতেই সে সিদ্ধহস্ত। অতএব তাকেই ডাকা হল। সবকিছু শুনে সে কিছুক্ষণ গাঁজায় দম দিয়ে চুপ করে বসে রইল। তারপর “বোম ভোলে! হর হর মহাদেব!” হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠল, “এখানে নৃমুণ্ডমালিনীর পূজা দিতে হবে। নইলে তোদের কেউ রক্ষা করতে পারবে না।“ সবাই রাজি হল। কিন্তু গুণিন এই সাবধান বাণীও দিল যে পর পর অন্তত তিন বছর এই পূজা চালিয়ে যেতে হবে। কোন বছর যদি পূজা বন্ধ থাকে, তাহলে বিপদ আবার ফিরে আসবে।

রামেশ্বর গুণিনের কথামত ষোড়শ উপচারে শ্মশান বিহারিণী দেবীর পূজার ব্যবস্থা হল। কিন্তু শবদেহের কি ব্যবস্থা হবে? ঠিক হল গ্রামের নিকটবর্তী শ্মশান থেকেই শবদেহ আনা হবে। পর পর দুবছর ঠিকঠাক পূজা সম্পন্ন হল। কিন্তু তৃতীয় বছরে একটা সমস্যা দেখা দিল। শ্মশান যে জমিতে ছিল, সেটা নাকি বিতর্কিত। জমির মালিক নাকি মামলায় জিতে জমির দখল নিয়ে কারখানা না কি করবে। অতএব কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী শ্মশান সরিয়ে নেওয়া হল। এবারে শবদেহ জোগাড় করাটা মুশকিল হয়ে দাঁড়াল। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোথাও শবদেহ পাওয়া গেল না। অভিসম্পাত করতে লাগল গুণিন। সেবছর পূজা আর হল না। তারপর একদিন রামেশ্বর গুণিনও ভোজবাজির মত গ্রাম থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। কোথায় গেল, কেন গেল কেউ বলতে পারল না। তাকে সেই গ্রামে আর কেউ কোনদিন দেখতে পায়নি।

সবার মনেই শঙ্কার মেঘ ঘনিয়ে এল। কাজলদিঘির আশেপাশে রাত্রিবেলা আবার শোনা যেতে লাগল নানারকম পৈশাচিক আর্তনাদ। সবাই জায়গাটা এড়িয়ে চলতে শুরু করল।

মনসুখ পাণ্ডে জন্মসূত্রে বিহারী, কিন্তু বহুবছর ধরে সে নিশ্চিন্দিপুরে বাস করছে। বাজারের কাছে তার একটা পানের দোকান আছে। প্রত্যেকদিনই সন্ধ্যে সন্ধ্যে সে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরে, কিন্তু সেদিন একটু বিক্রিবাট্টা ভালো ছিল বলে যেন একটু বেশীই দেরি হয়ে গেল। যাই হোক, দোকানপাট বন্ধ করে সে বাড়ি ফেরার পথ ধরল। বিক্রি ভালো হওয়াতে বেশ খোশ মেজাজ, একটা দেহাতি গান গুনগুন করতে করতে সে চলতে লাগল।     

মনসুখের বাড়ি ফেরার দুটো পথ আছে। একটা ঘুরপথ, বেশি সময় লাগে, কিন্তু ওই রাস্তায় কাজলদিঘি পড়ে না। আরেকটা কাজলদিঘির গা ঘেঁসেই, সেটা শর্টকাট হয়। মনসুখ ঠিক করল রাত হয়ে গেছে, শর্টকাট রাস্তাই ধরবে। জায়গাটার ইতিহাস তার খেয়ালই ছিল না। তাহলে হয়ত ওই রাস্তাটা সে বেছে নিত না।   



কাজলদিঘির ঠিক ধারেই একটা শ্যাওড়া গাছ আছে। সেটার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মনসুখের যেন মনে হল ফিসফিসিয়ে তার নাম ধরে কেউ ডাকল। কিন্তু ঘাড় ফিরিয়ে কাউকে দেখতে পেল না। ভাবল মনের ভুল। ভুল করে টর্চটাও দোকানে ফেলে এসেছে। পকেটে একটা দেশলাই বাক্স ছিল। বার করে দুএকটা কাঠি জ্বালাল। চারদিকে ভাল করে দেখল। নাহ, কেউ নেই। একটু এগিয়ে আবার সেই ডাক শুনল। এবার নজরটা শ্যাওড়া গাছের ওপর পড়ল। গাছের ওপরদিকের একটি ডালে যেন কেউ বসে আছে। আলো আধারিতে ভালো বুঝতে পারল না। মেয়েমানুষই মনে হল। কিন্তু এতরাতে গাছের ওপর সে কি করছে? একটু ভয়ও পেল, কৌতূহলও হল। দূর থেকেই ভাঙা ভাঙা বাংলায় জিজ্ঞাসা করল, “কে আপনি? এত রাতে গাছের উপর কি করছেন?” মূর্তিটার কোন হেলদোল নেই। পা টিপে টিপে আরেকটু এগিয়ে গেল। এইবারে যা দেখল তাতে তার সারা শরীরে শিহরণ খেলে গেল।

মনসুখ দেখল গাছের ডালে বসে তার দিকে চেয়ে রয়েছে একটি কঙ্কাল যার গায়ে সাদা কাপড় জড়ানো। তার নরকরোটির দুটি চোখের গহ্বরে যেন আগুনের গোলা জ্বলজ্বল করছে। কঙ্কালটি যেন হাতছানি দিয়ে তাকে ডাকল। বীভৎস দন্তবিকশিত হাসিও যেন একঝলক দেখা গেল। ভয়ে পিছিয়ে আসতে গিয়ে মনসুখের ডান পাটা একটা গর্তে গিয়ে পড়ল। গর্তে যেন নরম কাদার মধ্যে তার পাটা ঢুকে যেতে লাগল। ভর দিয়ে পাটাকে বার করতে গিয়ে কেমনভাবে যেন অপর পাটাও গর্তে গিয়ে পড়ল। গর্তটা যেন একটা সুড়ঙ্গের মত, তার শরীরটাকে আস্তে আস্তে টেনে নিচ্ছে। গায়ে যেন জলের ঝাপটাও লাগছে। তাকে কি কেউ দিঘির নিচে টেনে নিচ্ছে? শরীরে যেন ঠাণ্ডা কিছুর স্পর্শ পাচ্ছে মনসুখ। দম আটকে আসছে। তাকে কেউ যেন সাঁড়াশি দিয়ে পিষে ধরছে। শেষ মুহূর্তে কংকালের বিকট দংষ্ট্রাবিকশিত হাসি যেন দেখতে পেল মনসুখ। জলের উপরিভাগে কিছুক্ষণ আলোড়ন, হয়ত মনসুখেরই ছটপটানির ফলশ্রুতি, তারপর কিছু বুদবুদ ভেসে উঠল। তারপর দিঘির জল একদম স্থির।

পরের দিন সকালে গাঁয়ের মেয়েরা কাজলদিঘির পারে মনসুখের মৃতদেহটা আবিষ্কার করল। মনসুখ একাই থাকত, তাই রাতে তার জন্য কেউ খোঁজখবর করে নি। শোরগোল পড়ে গেল। কিন্তু কেউই কোন উপায় বাতলাতে পারল না এই বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার। গ্রাম পঞ্চায়েতের সভা ডাকা হল। আলাপ আলোচনার পর স্থির হল, আর কিছুদিন দেখা যাক। তেমন অপ্রীতিকর ঘটনা আবার ঘটলে ওই দিঘি মাটি ফেলে বুজিয়ে দিতে হবে। আপাতত রাত্রিবেলা ওই পথ কেউ যেন কোনভাবেই না মাড়ায়। বাড়ি বাড়ি গিয়ে সতর্ক করে দেওয়া হল।

কথায় আছে, ভাগ্যের লিখন কেউ খণ্ডাতে পারে না। সতর্ক করে দিলে কি হবে, ক্ষণিকের অসাবধানতায় বড় বিপদ ঘটে যেতেই পারে। গ্রামে চৌধুরীদের বাড়ির ছেলে সাগরেরও ঠিক তাই হল। সাগরের মায়ের এবং তার মাসির এই নিশ্চিন্দিপুর গ্রামেই বিয়ে হয়েছে। দুজনের শ্বশুরবাড়ির দূরত্ব বেশি নয়। গ্রামে ডাক্তার বদ্যির খুব সমস্যা। সামান্য জ্বরজারি হলেই পাশের গাঁয়ে ছুটতে হয়। সাগরের মার একদিন রাতে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর উঠল। সাগরের বাবা পড়ল মহা চিন্তায়। হঠাৎই তার মনে পড়ল সাগরের মাসির বর অল্প কবিরাজি বিদ্যা জানে, টুকটাক জ্বরজারির চিকিৎসাও করে থাকে। এত রাতে আর সাগরকে পাশের গাঁয়ে না পাঠিয়ে ওই বাড়িতে পাঠানোই সমীচীন হবে। সে সাগরকে ডেকে বলল, “বাবা সাগর, তোর মেসোমশাইয়ের কাছে এক ছুটে চলে যা। মার কথাটা বল। দেখ কিছু ওষুধ পথ্যির ব্যবস্থা দিতে পারে কিনা। আমি ততক্ষণ তোর মার জন্য জলপটির ব্যবস্থা করিগে।“ সাগর মা অন্ত প্রাণ, শুনেই মারল এক দৌড়। দৌড়াতে দৌড়াতে খেয়ালই নেই সে কাজলদিঘির কাছে এসে পড়েছে। হঠাৎই সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। চারিদিকে যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে।

তার দিঘির ওপর চোখ গেল। অদ্ভুত একটা নীল নীল আলো খেলে বেড়াচ্ছে। আলেয়া? হবে হয়ত। আচমকা সে মহিলার গলায় এক তীব্র আর্তনাদ শুনতে পেল। তার গা ছমছম করে উঠল। তাড়াতাড়ি এই জায়গাটা থেকে বেরোতে হবে। এই জায়গাটা অশুভ। কয়েকপা এগিয়েই দেখল সামনে একটা ডোবা। একি? এখানে তো আগে ডোবা ছিল না। অন্যদিকে যেতে গিয়ে আবার কয়েকপা ফেলে দেখে আরেকটা ডোবা। চারদিক যেন ডোবায় ভর্তি হয়ে গেছে। কি যে হচ্ছে, তার বোধগম্য হল না। পায়ে পায়ে কারা তার দিকে এগিয়ে আসছে? খনখনে গলায় কে যেন হেসে উঠল। সাগরের হাত পা সব ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। চারদিক থেকে নরকঙ্কালের দল তাকে ঘিরে ধরতে আসছে। তার মনের মধ্যে কে যেন আকুলিবিকুলি করে উঠল, “পালা, সাগর, পালা।“ কিন্তু পালাবে কোনদিকে? কঙ্কালের হাত থেকে বাঁচতে হলে তাকে দৌড়াতে হবে। কিন্তু যেদিকেই তাকাচ্ছে সেদিকেই ডোবা। যা থাকে কপালে ভেবে মারল ঝাঁপ সামনের ডোবাটায়। জল একদম কনকনে ঠাণ্ডা। পায়ে যেন লতার মত কি জড়িয়ে যাচ্ছে। যতই ছাড়ানোর চেষ্টা করছে, লতাগুলো যেন সাপের মত কিলবিল করে তার গলার দিকে এগিয়ে আসছে। পিচ্ছিল লতার স্পর্শ তাকে ভয়ার্ত করে তুলল। লতাগুলো তার গলায় চেপে বসে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসছে। শেষে এইভাবে তাকে মরতে হবে? তার চোখের সামনে যেন ভেসে উঠল মায়ের অসুস্থ মুখের ছবিটা, যাকে সে নিজের জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসে। আস্তে আস্তে সব ঝাপসা হয়ে এল। অতল জলের গহ্বরের আকর্ষণে যেন সে মৃত্যুর অন্ধকারে তলিয়ে গেল।

পরদিন সকালে সাগরের দেহটা দিঘি থেকে উদ্ধার হল। কোনভাবে সে দিঘিতে নেমেছিল আর পায়ে লতা জড়িয়ে যাওয়ায় আর উঠতে পারেনি। রাতেই খোঁজাখুঁজি শুরু হয়ে গেছিল, কিন্তু সে যে এই পথে আসবে, কেউ ভাবেনি আর সাহসও করেনি। গ্রামবাসীরা আর কোন ঝুঁকি নিল না। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে কাজলদিঘি মাটি ফেলে বুজিয়ে দেওয়া হল। এই দিঘির ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তাদের কাছে এখন শুধুই স্মৃতি।

Saturday, 6 October 2018

কুহকিনীর মায়া।

চলন্ত ডাউন বারুইপুর লোকালে বসে কাগজ পড়তে পড়তে হঠাৎই সামনের সিটের কোনার দিকে নজর পড়ল রজতের। একটি মেয়ে বসে তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে। এমনিতে রজতের চেহারাটা বেশ সুপুরুষ, রাস্তায় চলতে ফিরতে অনেকেই তার দিকে তাকিয়ে থাকে। সে খুব একটা পাত্তা দেয় না। কিন্তু এই ব্যাপারটা যেন একটু অন্যরকম। মেয়েটির চোখে যেন পলক পড়ছে না। চোখ সরিয়ে কিছুক্ষণ কাগজের দিকে মন দিয়ে আবার মেয়েটির দিকে তাকিয়ে দেখল একই ব্যাপার। স্থিরদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। মেয়েটি সালওয়ার কামিজ পরে রয়েছে, মাথায় ওড়নাটা হালকা ঢাকা দেওয়া আছে কিন্তু মুখটা বোঝা যাচ্ছে। অপূর্ব সুন্দরী না হলেও একটা আকর্ষণ আছে। কিন্তু চাউনিটা যেন কেমন। গা ছম ছম করে উঠল তার। এরকম অভিজ্ঞতা তার কোনদিনই হয়নি। জোর করে অন্যদিকে তাকিয়ে বসে রইল। তার স্টেশন আসাতে নেমেও গেল। একটু অন্যমনস্ক ছিল, অনেক ভিড়ের মধ্যে সেই মেয়েটিও নামল কিনা খেয়াল করতে পারল না। মন থেকে ব্যাপারটাকে ভুলে যাবার চেষ্টা করল।

কিন্তু পরের দিনও রজতের একই অভিজ্ঞতা হল। মেয়েটি ঠিক তার সামনের সিটে বসে তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রয়েছে। ব্যাপারটা কি? মেয়েটি কি তাকে চেনে? তাকে কি কিছু বলতে চায়? ডেকে জিজ্ঞাসা করলেই তো পারে, এমন অস্বস্তিকর ভাবে চেয়ে থাকার মানেটা কি? রজতের মনের মধ্যে একটা ধোঁয়াশা তৈরি হয়। 

পর পর বেশ কয়েকদিন তার এই অভিজ্ঞতা হয়। অফিসে, বাড়িতে, কাজে, কর্মে সব জায়গায় রজত যেন একটু চিন্তিত হয়ে পড়ে। এমনিতে সে খুব মিশুকে নয়, কিন্তু অফিসে অনিলই এমন একজন যার সঙ্গে সে নিজের সুখ দুঃখের কথা একটু আধটু ভাগ করে নেয়। একদিন সে বলেই ফেলল কথাটা। 

“জানিস অনিল, প্রত্যেকদিন অফিস থেকে ফেরার ট্রেনে আমার একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়।“
“সে কি রে? কিরকম শুনি?”
“একটা মেয়ে সামনের সিটে বসে আমার দিকে রোজ তাকিয়ে থাকে।“
“তাই নাকি? তা এতে অদ্ভুত কি আছে? তুই এত সুপুরুষ, হয়ত তোকে ভালো লেগেছে।“
“ব্যাপারটা এতো মজার নয় রে। মেয়েটার চাউনি যেন কেমন। আমার অস্বস্তি লাগে।“
“কেন? কি রকম চাউনি?”
“সে তোকে বলে বোঝানো যাবে না।”
রজত চুপ করে যায়। অনিলও ব্যাপারটা নিয়ে বেশি আর ঘাঁটায় না, নিজের কাজে মন দেয়।

আরও দুচার দিন এই ভাবে চলে। একদিন ট্রেনটা যেন একটু বেশিই ফাঁকা ছিল। মেয়েটি একদম তার সামনে এসে বসে পড়ল। রজত একটু চমকে উঠল। কিন্তু মনে মনে সে স্থির করল যে আজ সে মেয়েটির সঙ্গে কথা বলবেই। একটু গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের জড়তাটা কাটিয়ে সে জিজ্ঞাসা করল, “শুনুন, কিছু যদি মনে না করেন, আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?”
“হ্যাঁ, বলুন।“
“আপনি কি আমাকে কোনভাবে চেনেন? বা আগে কোথাও দেখেছেন?”
“কই, না তো।“
“তাহলে আপনি......আমার দিকে দেখি রোজই তাকিয়ে থাকেন?”
মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর এদিক ওদিক তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল, “আপনাকে আমার খুব ভালো লাগে।“
রজত চমকে উঠল। কি বলবে বুঝতে পারল না। একি মেয়েরে বাবা! সেদিন আর কথা এগোল না।


এরপর কয়েকদিন ট্রেনে যাতায়াত করতে করতে আরও কিছু কথা হল মেয়েটির সঙ্গে। আস্তে আস্তে রজতও সহজভাবে কথোপকথনে অংশগ্রহণ করতে লাগল। ধীরে ধীরে তার অস্বস্তি কাটতে লাগল। যদিও সে কখনো প্রশ্ন করেনি তাকে কেন মেয়েটির খুব ভালো লাগে।

কথায় কথায় অনেককিছুই সে জানতে পারল মেয়েটির সম্বন্ধে। তার নাম মোহিনী, সে একটি সওদাগরী অফিসে রিসেপশনিস্টের কাজ করে। বাবা মা সে ছোট থাকতেই মারা গেছেন, মামাবাড়িতেই মানুষ। বারুইপুরে সে একটা ঘর ভাড়া করে থাকে কারণ মামাবাড়িতে থাকার জায়গার খুব সমস্যা। মোহিনীও রজতের সম্পর্কে সবই জেনে নিয়েছে। বাবা মার একমাত্র ছেলে, ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা, উজ্জল ভবিষ্যৎ। কোম্পানিতে তার পদোন্নতি চোখে পড়ার মত। তরতরিয়ে উপরে উঠছে। কিছুদিনের মধ্যে রজতেরও মোহিনীকে ভালো লাগতে শুরু করল। 

এইরকম ভাবে চলছে। একদিন হঠাৎ মোহিনীই প্রস্তাবটা দিল, “চল না, একদিন ভিক্টোরিয়া, ময়দান এসব জায়গা ঘুরে আসি।“ রজত দেখল প্রস্তাব মন্দ নয়। প্রেম করার পক্ষে বেশ ভালো জায়গা এগুলো। এক রবিবার ঠিক হল যাওয়া। সময়টা বেশ কাটল দুজনের। ফেরার পথে একটা বেশ নামকরা রেস্তরাঁতে খেয়েও নিল দুজনে। কিন্তু যখন ট্যাক্সি করে ফিরছে সন্ধেবেলা, তখনই রজতের একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হল।

সেদিন মনে হয় পূর্ণিমা ছিল, আকাশে চাঁদটা থালার মত ঝলমল করছিল। ট্যাক্সিতে বসে রজত অবাক হয়ে লক্ষ্য করল যে মোহিনীর কোন ছায়া পড়ছে না। আর চাউনিটাও যেন কেমন অস্বাভাবিক। বাড়ি ফিরে সে এই ঘটনাটা নিয়ে বেশ ভাবিত হয়ে পড়ল। তবে কাউকে কিছু জানাল না।

অনেকদিন ধরেই মোহিনী বায়না করছিল যে কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে কোথাও আউটিংএ যাওয়া যায় কিনা। কিন্তু সেদিনের সেই ট্যাক্সির ঘটনা ঘটার পর রজতের খুব একটা উৎসাহ নেই। এদিকে মোহিনীরও প্রচণ্ড জেদ, যেতেই হবে। অগত্যা রজত রাজি হয়েই গেল। যদিও মনের ভিতরটা খচখচ করতেই লাগল।

দুজনে মিলে মন্দারমণিই ঠিক করল। বেশ নিরিবিলি জায়গা, বেড়ানোর পক্ষে বেশ ভালো। মালপত্র গুছিয়ে ট্রেনেই রওনা দিল। ট্রেনে মন্দারমণি যেতে গেলে কাঁথিতে নামতে হয়, সেখান থেকে আবার গাড়ির ব্যবস্থা আছে। বেশ ভালো একটা হোটেলে বুকিং করাই ছিল, সি ফেসিং একটা ঘর পাওয়া গেল। দিনের বেলা বেশ এদিক ওদিক ঘুরে ফিরে খাওয়া দাওয়া করে কেটে গেল সময়টা। কিন্তু রাত্রিবেলা যে ঘটনাটা ঘটল সেটা যেকোনো মানুষের মনকে বিভীষিকায় আচ্ছন্ন করার পক্ষে যথেষ্ট।

খাওয়াদাওয়া শেষ করে দুজনেই হোটেলে বেডরুমে এসে শুয়েছে। ঘুমোতে যাওয়ার আগে প্রত্যেকদিনই রজতের বই পড়া অভ্যেস। এদিন সে ব্রাম স্টোকারের “ড্রাকুলা” পড়ছিল। হঠাৎই মোহিনী তাকে জিজ্ঞাসা করল, “তুমি ভ্যাম্পায়ারে বিশ্বাস কর?”
“নাহ, তবে পড়তে ভালো লাগে এই আর কি।“
“ওঃ।“
কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর আবার প্রশ্ন করল, “যদি তুমি সামনাসামনি ভ্যাম্পায়ার দেখো, তোমার কেমন লাগবে?”
রজত চমকে উঠল। এই রকম প্রশ্ন সে আশা করেনি। মোহিনীর দিকে তাকিয়ে দেখল কেমন যেন নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ঘরের বাইরেও আবহাওয়াটাও যেন পরিবর্তিত হচ্ছে। ঠাণ্ডা একটা হিমেল হাওয়া যেন বইতে শুরু করেছে। মোহিনী হঠাৎই খিলখিল করে হাসতে শুরু করল। ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে “যত্তসব বাজে কথা” বলে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল রজত। বইটা রেখে আলোটা নিভিয়ে দিল। আজ আর তার কিছু ভালো লাগছেনা।

কিন্তু মাঝরাতে যখন মোহিনী তাকে কাছে টেনে নিল, তার মধ্যে কামনার প্রবৃত্তি জেগে উঠল। সবই ঠিকঠাক ছিল, শুধু মোহিনীর শরীরটা তার যেন অসম্ভব শীতল মনে হল। এই প্রথম তাদের দৈহিক সম্পর্ক, কিন্তু রজত যেন সম্পূর্ণভাবে তা উপভোগ করতে পারল না। নিজেকে তার যেন একটা যন্ত্র বলে মনে হল।

মিলন শেষে রজত এলিয়ে পড়েছিল। শরীরটা যেন নিস্তেজ। হঠাৎই দমকা হাওয়ায় ঘরের দরজাটা খুলে গেল। চমকে উঠে পাশ ফিরতেই দেখল মোহিনী পাশে নেই। গেল কোথায়? হঠাৎই বারান্দার দিকে নজর গেল। বারান্দায় কে যেন দাঁড়িয়ে? মোহিনী না? কিন্ত এ কোন মোহিনী? তার দেহটা যেন স্বচ্ছ, তার মধ্যে দিয়ে দুরের আকাশ, চিকচিকে তারা দেখা যাচ্ছে। মোহিনী তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকল। কিন্তু রজত কিংকর্তব্যবিমুঢ়। কিন্তু মন্ত্রের মত যেন তাকে মোহিনী টানছে। সে ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে গেল। সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই মোহিনী তাকে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু এই জড়ানো যেন প্রেমিকার আলিঙ্গন নয়। এ যেন অজগরের আলিঙ্গন। আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে তাকে। সে চিৎকার করতে গেল, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোন স্বর বেরোল না। তার গোটা শরীরটা যেন বরফ জলে ডুবে যাচ্ছে। মোহিনীর লিপস্টিকে রাঙা সুন্দর দুটি ঠোঁটের পাশ দিয়ে ভয়াল একজোড়া ছুঁচলো দাঁত বেরিয়ে আসছে কেন? এরকম কি কোন স্বাভাবিক মানুষের হয়? এক ঝাঁকুনি দিয়ে রজতের গলাটা তার দিকে টেনে নিয়ে মোহিনী দাঁত বসিয়ে দিল। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসছে, তা দিয়ে মোহিনী যেন কতদিনের তৃষ্ণা নিবারণ করছে। রজতের শরীরটা যেন খাঁচায় পোরা পাখির মত ছটফট করতে করতে স্থির হয়ে গেল। তাকে পালকের মত তুলে নিয়ে হোটেলের তিনতলার বারান্দা থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিল মোহিনী। সমুদ্রের ঢেউয়ের আওয়াজেই হয়ত নিচে পড়ার আওয়াজটা চাপা পড়ে গেল। জিঘাংসা ভরা দৃষ্টিতে নিচে একবার তাকিয়েই মোহিনী ধোঁয়ার মত বাতাসে মিলিয়ে গেল।

পরের দিন সকালে হোটেলের এক কর্মচারী রজতের মৃতদেহটা আবিষ্কার করে। চোখদুটো যেন ভয়ংকর কিছু দেখে ঠেলে বেরিয়ে এসেছে। শরীরটা যেন রক্তশূন্য কাঠের মত পড়ে রয়েছে। কেউ যেন তার সমস্ত রক্ত শুষে নিয়েছে। গলার বাঁদিকে দুটো গোল সমান্তরাল ক্ষতচিহ্ন। আস্তে আস্তে তার চারপাশের ভিড় পাতলা হতে শুরু করল। পুলিশকে খবর দিতে হবে।

Sunday, 23 September 2018

বিভূতিভূষণের জীবনের সত্য ঘটনা।

"বিভূতিভূষণের বৈঠকি গপ্পো" থেকে প্রাপ্ত। একটু ছোট করে লিখলাম। এইটা ঘাটশিলার কাছে সুবর্ণরেখা নদীর পারে ঘটেছিল। বিভূতিভূষণ পুজোর ছুটিতে ঘাটশিলা ভ্রমণে গেছিলেন। প্রায়ই সেখানে যেতেন কারণ তাঁর ছোট ভাই নুটুবিহারী সেখানে হাসপাতালের চিকিৎসক ছিলেন। বিভূতিভূষণ ছিলেন প্রকৃতি প্রেমিক আর ঘাটশিলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা কে না জানে। আর উনি ছিলেন অত্যন্ত আলাপী মানুষ, অল্প সময়ের মধ্যেই লোকজনের সঙ্গে আলাপ জমিয়ে ফেলতেন।

এমনি এক সন্ধ্যায় সবান্ধব বেড়াতে বেড়িয়েছিলেন। দেখতে দেখতে অনেক রাত হয়ে গেল, তাঁর বাড়ি ফেরার নাম নেই। বাড়ির লোকজন চিন্তিত হয়ে পড়ল। রাত দশটা বেজে গেল, তাই বাধ্য হয়েই ভাই নুটুবিহারী খোঁজ করতে বেরলেন। কিন্তু কেউই কিছু বলতে পারল না। হঠাৎই বিভূতিভূষণ সবার চিন্তার অবসান ঘটিয়ে বাড়ি ফিরলেন। দুজন বন্ধু তাকে আলো নিয়ে পৌঁছে দিয়ে গেলেন। সবারই প্রচণ্ড কৌতূহল, কি হয়েছিল। খেতে বসে ঘটনাটা বর্ণনা করলেন।   

হাঁটতে হাঁটতে সুবর্ণরেখার ধার ধরে অনেকদুর চলে গেছিলেন। পূর্ণিমার রাত। শ্মশানঘাটের কাছে পৌঁছে গেছেন সবাই। হঠাৎ করে তাঁর মনে হল যেন দূরে একটা খাটিয়ায় শায়িত শবদেহ দেখতে পেলেন। অথচ তাঁর সঙ্গে যারা ছিলেন তারা তা দেখতে পেলেন না এবং বিভূতিভূষণের কথা বিশ্বাসও করলেন না। মনের ভুল বলে উড়িয়েই দিলেন। শুধু তাই নয়, বাড়ি ফেরার তাগাদা লাগালেন। রাত্রিবেলা শ্মশানে বেশিক্ষণ না থাকাই ভাল, এই যুক্তিও দিলেন কেউ কেউ। কিন্তু বিভূতিভূষণের অলৌকিক ব্যাপার জানার অদম্য কৌতূহল ছিল। এত সহজে তিনি এই সুযোগ হাতছাড়া করতে রাজি নন। কিন্তু সঙ্গীরা তাকে একা কিছুতেই ছাড়বেন না। অগত্যা তাদের পিছন পিছন সাঁওতাল পাড়ার কাছে এসে তাঁর মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। সঙ্গীদের বললেন যে লোকালয় প্রায় এসেই গেছে, তারা এগিয়ে যান, তিনি একটু পরে যাচ্ছেন। সঙ্গীরা রাজি হলে তিনি লম্বা লম্বা পায়ে আবার শ্মশানে গিয়ে উপস্থিত হলেন। দেখলেন সত্যিই একটা শবদেহ সমেত খাটিয়া পড়ে রয়েছে। কৌতূহলবশত কাছে গিয়ে দেখলেন শবদেহটা একটা ছেঁড়া কাঁথা দিয়ে ঢাকা আছে। আশেপাশে কেউ নেই। শবযাত্রীরা এদিক ওদিক কোথাও গেছে ভেবে হাঁকডাক করলেন, কিন্তু কোন সাড়া পেলেন না। হঠাৎ তাঁকে কেউ যেন বলল "যা না...... কাঁথাটা সরিয়ে দেখ।" বিভূতিভূষণ শিউড়ে উঠলেন। পিছন দিকে তাকালেন কিন্তু কণ্ঠস্বরের অধিকারীকে দেখতে পেলেন না। ভাবছেন পালাবেন কিনা। কিন্তু কৌতূহল সম্বরণও করতে পারলেন না। আবার সেই রহস্যজনক কণ্ঠস্বর, "যা, যা না, এগিয়ে যা...... কাঁথাটা সরিয়ে দেখ।" তাকে যেন কোন অলৌকিক শক্তি শবদেহটার দিকে টানছে। কাঁথাটা সরিয়ে দেখলেন একজন বয়স্ক পুরুষের মৃতদেহ। বড় বড় চোখ মেলে তাঁর দিকে চেয়ে রয়েছে মনে হল। আরও কাছে মুখ আনতেই ভয়ে আর্তনাদ করে উঠলেন। মৃতদেহটার মুখাবয়ব একদম তাঁর মতন - অবিকল এক। যেন আয়নায় মুখ দেখছেন। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে তিনি ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে বাড়ী ফিরে এলেন। এর কিছুদিন পরেই তিনি পরলোক গমন করেন।

(সংগৃহীত)

Sunday, 22 July 2018

কায়াহীনের কাহিনী।

স্বামীর কথা আজও মনে পড়ে সুমিতার। স্বামী অল্প বয়েসেই তাকে ছেড়ে চলে যায়, কারণ সেই দুরারোগ্য ব্যাধি, ক্যান্সার। স্বামী তাকে খুবই ভালবাসত, অভাবের সংসার হলেও তাদের আনন্দের কোন অভাব ছিল না। হঠাৎই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত রাজীবের ফুসফুসে ক্যান্সার ধরা পড়ল। সুমিতার একমাত্র অপছন্দের কারণ ছিল রাজীবের চেন স্মোকিং আর সেটাই কাল হল। মাত্র ৩১ বছর বয়েসেই এই পৃথিবী ছেড়ে তাকে চলে যেতে হল। সুমিতা একা হয়ে গেল। এক ঝটকায় তার সুন্দর জীবনে অন্ধকার নেমে এল। সে কোনরকমে একটা চাকরি জোগাড় করল কিন্তু মনে আর শান্তি রইল না।

স্বামী মারা যাবার পর বেশ কয়েকমাস হয়ে গেছে। সে অফিসে বেশ কিছুদিন ধরেই একটা গুরুত্বপূর্ণ ফাইল খুঁজে পাচ্ছিল না। বসের বকাবকি খেয়ে মনমেজাজ বেশ খারাপ। সোমবার অফিসে গিয়ে সে অবাক হয়ে গেল। তার টেবিলের ওপরেই ফাইলটা পড়ে রয়েছে। আশেপাশের সহকর্মীদের জিজ্ঞাসা করল কেউ নিজে থেকে ফাইলটা খুঁজে পেয়ে দিয়ে গেছে কিনা। কেউই কিছু বলতে পারল না। সুমিতা এর কোন যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা খুঁজে পেল না। যাই হোক, এই ব্যাপারটা নিয়ে খুব বেশি সে আর মাথা ঘামাল না। হয়ত কোন উপকারী বন্ধু, যে নিজের পরিচয় দিতে অনিচ্ছুক।

কয়েকদিন পরের কথা। সুমিতা নিজের ঘরে বসে রয়েছে। সন্ধ্যে পেরিয়ে রাত নামতে যায়। হঠাৎ মনে হল যেন পাশের ঘর থেকে কেউ খুব আস্তে বেহালা বাজাচ্ছে। গাটা যেন ছমছম করে উঠল তার। রাজীবও বেহালা বাজাতে খুব ভালবাসত। কিন্তু এ কি করে সম্ভব? পাশের ঘরে একবার গিয়ে দেখবে নাকি? সাহস করে একবার দরজাটা ঠেলে দেখল আবছা অন্ধকারের মধ্যে যে দোলান চেয়ারে বসে রাজীব মাঝে মধ্যে বেহালা বাজাত, সেই চেয়ারটা ক্যাঁচকোঁচ শব্দ করে দুলছে। সারা শরীরে যেন একটা শিহরণ বয়ে গেল সুমিতার। তবে কি রাজীবের অতৃপ্ত আত্মা পৃথিবীর মায়া কাটাতে পারেনি? তার আশেপাশেই ঘুরছে? তাকে ভুলতে পারছে না? এটা কি শুভ না অশুভ ইঙ্গিত? সুমিতা আর ভাবতে পারছে না।

আরেকদিনের কথা। সুমিতা বাজার করে সকালবেলা ফিরছিল। বাজারের আগে রাস্তাটা পার করতে গিয়ে মনে হয় একটু অন্যমনস্কই হয়ে পড়েছিল। হঠাৎই সামনে চলে এল যমদূতের মত এক প্রকাণ্ড লরি। সুমিতার মনে হল বোধহয় এই তার জীবনের শেষ মুহূর্ত। আর তার বাঁচা হল না। হঠাৎই লরির ড্রাইভার যেন কি দেখে ভয়ে প্রাণপণ চিৎকার করে সশব্দে ব্রেক কষল। সুমিতা চোখ বন্ধ করেই ফেলেছিল। ভয়ে ভয়ে চোখ খুলে দেখে যে সে বহাল তবিয়তে রয়েছে এবং লরিটা ঠিক তার দুহাত সামনে থেমে রয়েছে। সম্পূর্ণ অলৌকিক ব্যাপার। আস্তে আস্তে নিজেকে সামলে নিয়ে সুমিতা বাড়ি ফিরে এল। ড্রাইভারটা তখনও “ভুত ভুত” বলে বিড়বিড় করছে।   

আরও কয়েকদিন পরের কথা। দুপুরের রান্না চাপিয়ে চেয়ারে বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিল সুমিতা। কখন যে চোখের পাতাদুটো ভারি হয়ে এসেছে খেয়াল নেই। হঠাৎ রান্না পোড়া যাওয়ার গন্ধে তার চটকা ভাঙল। একি? রান্নাঘরে তো পুরো দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে! গ্যাস সিলিন্ডারটা লিক করেছে নির্ঘাত। এইবার তার আর পরিত্রাণ নেই। চোখ বুজে ইষ্টনাম জপ করতে শুরু করল। হঠাৎ করে কে যেন এক বালতি জল রান্নাঘরের মধ্যে ছুঁড়ে দিল। তাজ্জব ব্যাপার। সুমিতা দেখল জাদুমন্ত্রের মত আগুনটা নিভে গেল। এইভাবে সে আরেকবার ভয়ংকর বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেল। মনে মনে সে সেই অশরীরী অথচ উপকারী বন্ধুকে ধন্যবাদ জানাল। 

আরেকদিনের ঘটনা। অফিস থেকে বেরোতে বেশ দেরিই হয়ে গেছিল সুমিতার। তার বাড়ির আগে একটা পার্ক পড়ে যেখানে রাত্রিবেলা কিছু সমাজবিরোধী আস্তানা গাড়ে। পার্কটার কাছে পৌঁছে লক্ষ্য করল তিন চারজন লোক তার পিছু নিয়েছে। সে ভয় পেয়ে পা চালিয়ে হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু লোকগুলোও চলার গতি বাড়াল। খারাপ মতলবই মনে হচ্ছে। মনে মনে সুমিতা ইষ্টনাম জপ করতে লাগল। হঠাৎই দুটো লোক লাফ দিয়ে পড়ে সামনে রাস্তা আটকাল। মুখে একটা অশ্লীল মন্তব্য করে তার দিকে এগিয়ে এল। আজকাল মেয়েরা আত্মরক্ষার জন্য লঙ্কার স্প্রে, ছোট ছুরি এবং আরও অন্যান্য জিনিস সঙ্গে রাখে। দুর্ভাগ্যবশত আজ ও রকম কিছুই তার সঙ্গে নেই। ভয়ে তার গলা শুকিয়ে এল। নাহ, আজ নিজের সম্মানটুকু রক্ষা করা যাবে বলে মনে হয় না। হঠাৎই জাদুমন্ত্রের মত একটা ব্যাপার ঘটে গেল। একদম সামনের লোকটাকে অদৃশ্য কেউ যেন এক ধাক্কা মেরে ছিটকে ফেলে দিল। পাশের জনকে কেউ যেন জামার কলার ধরে মাটি থেকে হাতখানেক উপরে তুলে দিয়েছে। ভয়ে হাত পা ছুঁড়ছে লোকটা। ব্যাপার স্যাপার দেখে অন্য দুটো লোক বেশ ঘাবড়ে গেল। পিছু ফিরে দে দৌড়। এরকম কাণ্ড কারখানা জীবনে তারা দেখেছে বলে মনে হয় না। সুমিতার সামনের দুটো লোকও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কিছুক্ষণ নিজেদের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাল। সুমিতা কিছুক্ষণ হতভম্বের মত দাঁড়িয়ে থেকে পায়ে পায়ে নিজের ফ্ল্যাটের দিকে হাঁটা দিল। আজও সে এক ভয়ংকর বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেল। রাজীব যেন অন্য জগতে গিয়েও তাকে ভুলতে পারেনি। কায়াহীন অস্তিত্ব নিয়েও তাকে সবসময় অনুসরণ করে চলেছে এবং সব রকম বিপদের হাত থেকে রক্ষা করে চলেছে। সুমিতা মনে মনে ঈশ্বরকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাল এই ভেবে যে এই অলৌকিক ঘটনা খুব কম লোকের জীবনেই ঘটে আর সে এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে পেরেছে। এক অপূর্ব প্রশান্তিতে তার মন ভরে উঠল।

Saturday, 23 June 2018

বৈশিষ্ট্য।

সুদেষ্ণার খুবই অদ্ভুত লেগেছিল যখন এত খেলনা থাকতে মেয়ে রিমি ওই পুতুলটা কিনে দেবার জন্যই বারবার করে বায়না করছিল। মেয়ে খুবই জেদি আর বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে মার কাছেই তার সব চাহিদা। এমনিতে হট হুইলস বা জি আই জো বেশি পছন্দ করে, বারবি ডলও অপছন্দ নয়, কিন্তু আজকে নিউ মার্কেটের এই খেলনার দোকানে এসে সে যেন কিছুতেই ওই অদ্ভুত পুতুলটার থেকে চোখ সরাতে পারছিল না। পুতুলটা একটা মেয়ে পুতুল কিন্তু মুখের অভিব্যক্তি একদমই আর পাঁচটা সাধারণ পুতুলের মত নয়। কেমন যেন ভাবলেশহীন ভাবে তাকিয়ে রয়েছে, চোখগুলোও যেন বিস্ফারিত। হঠাৎ দেখলেই যেন গাটা কেমন শিউরে ওঠে। যাই হোক, মেয়ের বায়না সামলাতে না পেরে তিনশ টাকা দিয়ে কিনেই দিল পুতুলটা। কিন্তু মনটা যেন কেমন খচখচ করতে লাগল।

অনেকক্ষণ পুতুলটা নিয়ে খেলার পর রাত্রিবেলা পুতুলটা মাথার কাছেই নিয়ে শুয়ে পড়ল রিমি। সে আজকে খুবই খুশি মা তার বায়না মেনেছে বলে। মাঝরাতে হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল তার। করিডোরের আলোটা যেন কে জ্বালিয়ে দিয়েছে আর কেউ যেন দাঁড়িয়ে রয়েছে দরজার কাছে। ভালো করে দেখার আগেই যেন মূর্তিটা অদৃশ্য হয়ে গেল। আর লাইটটাও কেউ নিবিয়ে দিল। বাড়িতে তো সে আর মা ছাড়া আর কেউ নেই। কিন্তু মা তার সাথে এরকম করবে কেন? হঠাৎই তার পুতুলটার ব্যাপারে খেয়াল হল। ওটাকে সে শুইয়ে রেখেছিল, কিভাবে যেন দাঁড়িয়ে পড়েছে। পুতুলটাকে ঠিকঠাক শুইয়ে সে নিজেও শুয়ে পড়ল। আবার কিছুক্ষণ আধা ঘুম আধা জাগা অবস্থা। হঠাৎ মনে হল ঘরের ঠিক মাঝখানে কেউ দাঁড়িয়ে রয়েছে। বেডল্যাম্পটা জ্বালিয়ে তড়াক করে বিছানায় উঠে বসল রিমি। কিন্তু কেউ নেই। একবার ভাবল মাকে ডাকবে। আবার একটু দ্বিধাবোধ করল। কি দরকার, বকাবকি করবে, সারাদিন অফিসে অজস্র কাজ করতে হয়। তারই মনের ভুল হবে। আবার সাহস করে শুয়ে পড়ল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে তার মনে হল, তার একদম ঘাড়ের কাছে কেউ নিঃশ্বাস ফেলছে। পাশ ফিরেই দেখল পুতুলটা একদম বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু তিনফুটের পুতুল যেন ছফুট লম্বা হয়ে গেছে আর তার মুখের অভিব্যক্তি যেন আরও হিংস্র হয়ে গেছে। আস্তে আস্তে সে রিমির দিকে এগিয়ে আসছে। গলায় যেন ফাঁসের মত কী একটা চেপে বসল। অন্ধকারের মধ্যে যেন আরও ঘন অন্ধকার নেমে আসছে। রিমির নিথর শরীরটা বিছানার ওপর এলিয়ে পড়ল।

পরের দিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে সুদেষ্ণার কেমন যেন একটা খটকা লাগল। রিমির স্কুলের দিনে কোনদিন তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতে হয় না, কিন্তু আজকে তো তার কোন সাড়াশব্দ নেই। রিমির ঘরের কাছে গিয়ে দেখল দরজাটা আলতো করে ভেজানো। একটু ঠেলা দিতেই পুরোপুরি খুলে গেল। রিমির নিষ্প্রাণ দেহটা এলিয়ে পড়ে রয়েছে বিছানায়। চোখগুলো যেন ঠেলে বেরিয়ে এসেছে আর তার গলাটা দুহাতে জড়িয়ে ধরে পুতুলটা যেন একটা পৈশাচিক হাসি হাসছে তার দিকে তাকিয়ে। একটা মর্মান্তিক আর্তনাদ করে সুদেষ্ণা মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।

Sunday, 27 May 2018

অভিশপ্ত ইঁদারা।

মনোজদের বাড়িটা বেশ পুরানো। প্রায় একশ বছরের কাছাকাছি বাড়িটার বয়েস। বাড়িটার পিছন দিকে একটা ইঁদারা বা বাঁধানো পাতকুয়া আছে। কিন্তু বহু বছর আর ওটা কেউ ব্যবহার করেনা। বাড়িটার কিছু ইতিহাসও আছে বটে। এই বাড়ির যিনি মালিক ছিলেন তার স্ত্রী সাংসারিক কারণেই হোক বা অন্য কোন কারণেই হোক ওই ইঁদারায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। তারপর ওই বাড়ির মালিক মনোজের ঠাকুরদাকে বাড়িটি বিক্রি করে দিয়ে চলে যান। কোথায় যান, তা আর জানা যায়নি বা কেউ জানার চেষ্টাও করেনি। ইঁদারার আশেপাশে এখন ঝোপঝাড় গজিয়ে গেছে। ওই দিকটা সবাই এড়িয়েই চলে। ওটা নাকি অশুভ। বহু বছর আগে মনোজের ঠাকুমা একবার জল তুলতে গিয়ে ভয়ংকর কিছু দেখে অজ্ঞান হয়ে যান। তার পর থেকে যে ক বছর বেঁচে ছিলেন, সে সময় তার মধ্যে কিছুটা অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা গেছিল। সব সময় বিড়বিড় করে কি বলতে থাকতেন, বোঝাই যেত না। 

মনোজ ছোটবেলা থেকেই বেশ সাহসী এবং যেকোনো অজানা ব্যাপারই তাকে ভীষণভাবে আকর্ষণ করে। এখন সে কলেজে পড়ে। মাকে একদিন খেতে বসে ইঁদারাটার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাও করেছিল কিন্তু মা তার দিকে এমনভাবে তাকাল যে সে আর দ্বিতীয় কথা বলার সাহস পায়নি। কিন্তু ভিতরে ভিতরে ইঁদারাটার ব্যাপারে জানার কৌতূহল তাকে কুরে কুরে খেয়েছে। একদিন সে এই ইঁদারার ব্যাপারটা ঠিক জানবে মনে মনে স্থির করল।


মনোজ সুযোগের অপেক্ষায় ছিল কবে বাড়িটা একটু ফাঁকা হবে। কিন্তু কিছুতেই সেই সুযোগ সে পাচ্ছিল না। বাড়িতে সব সময় লোক রয়েছে। অবশেষে সেই সুযোগ সে পেল। তাদের এক দুরসম্পর্কের আত্মীয়ের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান, বাড়ির সব লোকই নিমন্ত্রিত। সে না যাবার একটা ছুতো খুঁজছিল। হঠাৎই মাথায় একটা বুদ্ধি এল। সে মাকে বলল পেটটা বড় ব্যথা করছে, অতএব সে যেতে চায় না। তাছাড়া সামনে পরীক্ষাও আছে, তার জন্য কিছু পড়ার কাজ বাকি আছে। মা অনুমতি দিল বাড়িতে থাকার। ব্যাস, আর কি চাই? কিন্তু বাড়ির লোকেরা রওনা দিতে দিতে প্রায় সন্ধ্যে হয়ে যাবে। সুতরাং সন্ধ্যের আগে কিছু করা যাবে না। বাড়ির লোকেরা সব বেরিয়ে যেতেই সদর দরজায় তালা দিয়ে সে হাতে একটা টর্চ আর লাঠি নিয়ে ইঁদারাটার দিকে এগোল। লাঠি নেবার কারণ সাপখোপ থাকতে পারে, যা ঝোপঝাড়! ইঁদারার কাছে এসে তার মনে হল মৃদু গলায় তাকে কেউ যেন ডাকল। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না। কেউ তো এসময় থাকার কথাও নয়। অগত্যা সে ইঁদারার দিকে মনোনিবেশ করল। নিচে জল আছে, কিন্তু ভিতরে বাইরে সব জায়গায় শ্যাওলা পড়ে গেছে। আকাশে হালকা চাঁদের আলো রয়েছে, তাও সে টর্চটা জ্বালল। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, এই কদিন আগেই টর্চে ব্যাটারি ভরা হয়েছে, বার কয়েক টিমটিম করে জ্বলেই নিভে গেল। মনোজের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। সে তবুও সাহস সঞ্চয় করল এবং ইঁদারার নিচের দিকে তাকাল। আবছা আলোয় মনে হল তার নিজেরই প্রতিবিম্ব দেখতে পেল। কিন্তু প্রতিবিম্বটা যেন ক্রমশ বড় হচ্ছে আর উপর দিকেই উঠে আসছে। না, তার তো মাথায় এত বড় বড় চুল নেই আর মুখটাও এত ফ্যাকাসে নয়। এতো যেন কোন বয়স্ক মহিলার মুখ। অপলক দৃষ্টিতে মনোজের মুখের দিকে মুখটা তাকিয়ে রয়েছে। মুখের অভিব্যক্তি বর্ণনার বাইরে। মনোজের শরীরটা যেন শক্ত কাঠের মত হয়ে গেল, নড়াচড়া করার আর শক্তি নেই। হাত থেকে লাঠি আর টর্চ মাটিতে পড়ে গেল। হঠাৎ মহিলাটি তার দিকে হাত্টা বাড়াল। মনোজও মন্ত্রমুগ্ধের মত তার ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল। কি হিমশীতল সেই স্পর্শ! তার দেহটাকে কেউ যেন পালকের মত তুলে নিয়েছে এবং ইঁদারার ভিতরে টেনে নিচ্ছে। তার মাথাটা নিচে আর পাগুলো ওপরে। ঠাণ্ডা জল তার শরীরটাকে স্পর্শ করল। সে ডুবছে, ক্রমশ ডুবছে। গলায় যেন ফাঁসের মত কি চেপে বসছে। তার সব অনুভূতি যেন তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ জলের উপরিভাগে একটু আলোড়ন, তারপর কয়েকটা শুধু বুদবুদ ভেসে উঠল। চারিদিক নিস্তব্ধ এখন।

পরের দিন সকালে বাড়ির লোকেরা দরজা ভেঙে বাড়িতে ঢুকে মনোজকে খুঁজে না পেয়ে তটস্থ। অবশেষে ইঁদারার পাশে পড়ে থাকা লাঠি আর টর্চ দেখে তাকে খুঁজে পাওয়া গেল। রীতিমত দড়ি বেঁধে লোক নামিয়ে তার নির্জীব দেহটা তুলে আনা হল। সারা শরীরে যেন একফোঁটা রক্ত নেই, চোখগুলো যেন ভয়ংকর কিছু দেখে বিস্ফারিত হয়ে রয়েছে। পুরো বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে এল। পরে মনোজের বাবার নির্দেশে ইঁদারার মুখটা বন্ধ করে দেওয়া হল যাতে এই ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা আর না ঘটে।

Sunday, 1 April 2018

বন্ধ দরজা।

পাখির ছবি তোলা রণবীরবাবুর অনেকদিনের শখ। যখনই সুযোগ পান বেরিয়ে পড়েন তার নিকন ডি ৭০০০ ক্যামেরাটা পিঠে ঝুলিয়ে। দুর্দান্ত এস এল আর ক্যামেরা, পাখির ছবি তোলার জন্য একেবারে আদর্শ। সঙ্গে ৮০-৪০০ লেন্সও রাখেন। তার তোলা ছবি বিভিন্ন নামকরা বন্যপ্রাণী বিষয়ক পত্রিকায় ছাপা ও প্রশংসিত হয়। এইবারে খবর পেলেন বর্ধমান জেলার পূর্বস্থলীর চুপি চরে নানারকম বিদেশী পরিযায়ী পাখি আসে। অতএব পূর্বস্থলী যেতেই হচ্ছে। সকালবেলা বিধাননগর স্টেশন থেকে কাটোয়া লোকাল ধরলেন। পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় দুপুর হয়েই গেল। পৌঁছে স্টেশনের কাছেই একটা ছোটখাটো হোটেলে দুটো খেয়ে নিলেন। স্টেশন থেকে চুপি চর যাবার ভ্যান রিকশা ভাড়া পাওয়া যায়, তারই একটা নিয়ে রওনা দিলেন। পথেই রিকশাওয়ালার মুখে জানতে পারলেন, পাখির ছবি তোলার একদম আদর্শ সময়ে (জানুয়ারি মাস) এসেছেন। চুপি চরে পৌঁছে দেখলেন পাখির ছবি তোলার উৎসাহী লোকজনের অভাব নেই। নৌকায় উঠে তিনিও ফটো তুলতে মগ্ন হয়ে পড়লেন। বিভিন্ন ধরনের পাখি, তাদের বিভিন্ন রকমের আচার আচরণ, খুবই মনমুগ্ধকর। ফটো তুলতে তুলতে সময় যে কি ভাবে কেটে গেল, টেরই পেলেন না। হঠাৎই খেয়াল হল যে বিকেল হয়ে এসেছে, বাড়ি ফিরতে হবে। তড়িঘড়ি মাঝিকে বলে নৌকা পারে লাগিয়ে নেমে পড়লেন। শিয়ালদা কাটোয়া লোকাল অনেকক্ষণ বাদে বাদে ট্রেন, মিস করলে আজকে আর বাড়ি ফিরতে পারবেন না। একটা ভ্যান রিকশা ভাড়া পেয়ে গেলেন, উঠেই বললেন, “স্টেশন, একটু তাড়াতাড়ি চলো ভাই।“ উত্তরে রিকশাওয়ালা বিড়বিড় করে কি বলল, বোঝা গেল না। মুখটা যেন একটু বেশি রকমই কাপড় দিয়ে ঢাকা।

রিকশা চলছে তো চলছেই, পথ যেন আর ফুরায় না। রণবীরবাবুর অবাক লাগল। চুপি চর থেকে পূর্বস্থলী স্টেশন অল্প কিছুক্ষণের পথ, এতো সময় কেন লাগবে? কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর জিজ্ঞাসা করলেন, “ও ভাই, স্টেশন এত সময় লাগছে কেন? রাস্তা ভুল করলে নাকি?” কোন উত্তর নেই। একটা অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করলেন, কিছুক্ষণ আগে ডানদিকে একটা মন্দির ছেড়ে এসেছিলেন, আবার সেই মন্দিরটা সামনে দেখা যাচ্ছে। একই রাস্তায় বারবার করে ঘুরছেন নাকি? ভয়ে শিউড়ে উঠলেন। আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “ও ভাই, কি হল, রাস্তা ভুল করলে নাকি?” রিকশাওয়ালা নির্বাক। হঠাৎই একটা ঝটকা দিয়ে রিকশাটা দাঁড়িয়ে পড়ল। রণবীরবাবু বলে উঠলেন, “কি হল? হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লে যে?” ভাঙা ভাঙা গলায় জবাব এল, “চেন পড়ে গেছে বাবু, রিকশা আর যাবে না।“ রণবীরবাবু দেখলেন মহা বিপদ। জিজ্ঞাসা করলেন, “এখান থেকে স্টেশন কিভাবে যাব?” রিকশাওয়ালা মুখে কিছু না বলে একটা মেঠো পথ দেখিয়ে দিল। অগত্যা কোন উপায় না দেখে সেই পথ ধরেই হাঁটতে শুরু করলেন। একটু গিয়ে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখলেন রিকশাওয়ালা তাঁর রিকশা সমেত অদৃশ্য হয়ে গেছে। ভয়ে বুকটা কেঁপে উঠল তার। সামনে তাকিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। অনেক দূরে দূরে একটা করে আলো, অল্প বাড়িঘর, কিন্তু বড্ড নির্জন। কিছুক্ষণ পরে একটা পোড়ো বাড়ির সামনে এসে পৌঁছলেন। খুবই পুরনো বাড়ি, চারিদিকে কাঠের বেড়া দেওয়া। ঢুকেই আঁতকে উঠলেন। বাড়ির আশেপাশে বেশ কিছু মড়ার খুলি ও কাঠের পোড়া আসবাবপত্রের টুকরো ছড়ানো। তাড়াতাড়ি গেট খুলে বাইরে এসে আবার দ্রুতগতিতে হাঁটতে শুরু করলেন। কিছুক্ষণ গিয়ে আবার দেখলেন একটা পোড়ো বাড়ি। আরে, এই বাড়িটা তো আগের বাড়িটার মত হুবহু এক দেখতে। গেট খুলে সেই মড়ার খুলি ছড়ানো দেখে আবার দ্রুতগতিতে বেরিয়ে আসা, পথ চলতে থাকা। পরপর চার পাঁচবার রণবীরবাবুর একই অভিজ্ঞতা হল। সারা শরীর এই শীতকালে ঘামে ভিজে চপচপ করছে, পিঠে কামেরার ব্যাগটা মনে হচ্ছে যেন এক মণ ওজন। পাগুলো যেন অবশ হয়ে আসছে। আবার সেই পোড়ো বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন। বাড়িটা যেন তাকে চুম্বকের মত টানছে। মড়ার খুলিগুলো পেরিয়ে একটা দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। একটু ঠেলতেই দরজাটা খুলে গেল। কিছুটা এগিয়ে আবার একটা দরজা। একটু ইতস্তত করলেন। মনের মধ্যে কে যেন বলে উঠল, “খুলিস না, দরজাটা খুলিস না।“ দেখলেন দরজার তলা দিয়ে যেন পাকিয়ে পাকিয়ে ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে। কিন্তু তবুও দরজাটা খুলে ফেললেন। খুলে দেখলেন এক ভয়ংকর দৃশ্য। সারা ঘরে লেলিহান আগুনের শিখা এবং তার মধ্যে একটি যুবতী মেয়ে আগুন থেকে বাঁচবার জন্য আর্তনাদ করছে। কি মর্মান্তিক ও ভয়ংকর সে দৃশ্য! রণবীরবাবু যেন কিংকর্তব্যবিমূড় হয়ে পড়লেন। আচমকা আগুনের শিখা রণবীরবাবুর দিকেও ধেয়ে এল। পালাতে গিয়েও পালাতে পারলেন না। যুবতী মেয়েটি যেন তাকে হাত ধরে টানতে লাগল। সারা শরীরে যেন উত্তপ্ত লোহার ছ্যাঁকা লাগছে। আর্তস্বরে চিৎকারে ঘরটি যেন কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল। লেলিহান অগ্নিশিখা ক্রমশ দুজনকেই গ্রাস করল। মেঝে্তে পড়ে রইল শুধু একরাশ ছাই, দুটি মড়ার খুলি ও কিছু হাড়গোড়।
পুনশ্চঃ ওই বাড়িতে বহুবছর আগে আগুন লেগে বেশ কিছু লোকের প্রাণহানি হয়েছিল।